ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগার থেকে অন্য আসামির জামিনের কাগজে ভর করে পালিয়ে যাওয়া হত্যা মামলার আসামি মো. হৃদয়কে (২৮) ধরতে পুলিশের পাশাপাশি তৎপর কারা কর্মকর্তারাও। তবে ঘটনার ৪ দিনেও ধরা সম্ভব হয়নি তাকে।
গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টার দিকে কারাগার থেকে পালান হৃদয়। এ নিয়ে চলছে তোলপাড়। একাধিক তদন্ত কমিটি হয়েছে। সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন ডেপুটি জেলার ও ছয় কারারক্ষী। হ্নদয়কে পালিয়ে যেতে সহযোগিতাকারী দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়া হৃদয়সহ সাতজনের বিরুদ্ধে জেলার মনজুরুল ইসলাম বাদী হয়ে একটি মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার ২ নম্বর আসামি দিদার হোসেন (২৮) ও মো. পলাশ হোসেনকে (২৫) শুক্রবার গভীররাতে সদর উপজেলার সুলতানপুর থেকে গ্রেপ্তার করে সদর থানা পুলিশ।
পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে দিদার হোসেন জানায়, হৃদয় তাকে ২ হাজার টাকা দেবে বলে কারা অভ্যন্তরে কথা হয়। এর বিনিময়ে তার পরিচয় ব্যবহার করে সে কারাগার থেকে বেরিয়ে যাবে।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সদর মডেল থানার উপ–পরিদর্শক (এসআই) মো. মোমিনুল ইসলাম জানান, হত্যা মামলার আসামি হ্নদয় দিদারের নাম-ঠিকানা বলে কারাগার থেকে বের হয়ে যাবে বলে তাদের মধ্যে কথাবার্তা হয়। এজন্য সে দিদারকে ২ হাজার টাকা দেওয়ার কথা বলে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা আরও জানান, মামলার অন্য চার আসামি নবীনগরের নান্দুরার বিল্লাল মিয়া (২২), কসবার কোল্লাবাড়ির আক্তার হোসেন ছোটন (৩০), সিলেট মোগলাবাজারের শিপন মিয়া (৪৫) ও কসবার সোনারগাঁওয়ের মনির হোসেন (৫৫) কারা অভ্যন্তরে রয়েছে। ৪ কয়েদি-হাজতিকে এই মামলায় শোনএ্যারেষ্ট দেখানো হয়েছে। পলাতক হ্নদয়কে ধরতে পুলিশের একটি টিম মাঠে রয়েছে। ওদিকে ঘটনার পর থেকে হ্নদয়কে ধরতে তৎপর কারা কর্মকর্তারা। তারা হৃদয়ের বাড়ি এবং তার শ্বশুরবাড়িসহ বিভিন্ন স্থানে গিয়ে তার খোঁজ করছে।
এ বিষয়ে জেলা কারাগারের জেলার মনজুরুল ইসলাম বলেন, ‘তদন্ত কমিটি তদন্ত করে গেছে। পালিয়ে যাওয়া হৃদয়কে ধরতে কারাগারের নিজস্ব টিম প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। অতিদ্রুত সে ধরা পড়বে আশা করছি। সে দেশেই আছে তার বাড়ির আশেপাশেই রয়েছে। সতর্কভাবে চলছে।’
ঘটনার বিষয়ে মামলার এজাহারে বলা হয়, নবীনগর থানার গত ১৬ জানুয়ারির একটি জিডিমূলে কারাগারে আটক ছিলেন ওই উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামের আব্দুল মোতালেবের ছেলে দিদার হোসেন। তার জামিননামা গত ২৯ জানিয়ারি কারাগারে পৌঁছায়। ওইদিন জামিনপ্রাপ্ত আসামিদের জেলা কারাগার থেকে মুক্ত করার সময় দুপুর ১১টা ৫২ মিনিটের দিকে হত্যা মামলার আসামি কসবার নিমবাড়ির মুজিবুর মিয়ার ছেলে হৃদয় দিদার হোসেনের পরিচয়ে মুক্ত হওয়ার জন্য এগিয়ে আসে। কেস হিস্ট্রি টিকিটে থাকা দিদার হোসেনের ছবি তুলে ফেলে দিয়ে ছবি হারিয়ে গেছে বলে জানায় হৃদয়। এসময় অন্য কয়েদি-হাজতি কয়েকজন হৃদয়কে প্রকৃত জামিনপ্রাপ্ত আসামি দিদার বলে শনাক্ত করে। এরপর কর্তব্যরত কারারক্ষী হৃদয়কে দিদার বলে মুক্ত করে দেয়। পরে কারা কর্তৃপক্ষের জিজ্ঞাসাবাদে পরস্পর যোগসাজশে পরিকল্পিতভাবে হৃদয়কে দিদার পরিচয়ে কারামুক্ত করার কথা স্বীকার করে তারা।
ঘটনার বিষয়ে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে কারা কর্তৃপক্ষের দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, বিষয়োক্ত বন্দি অর্থাৎ হৃদয় কারা ফটকে প্রবেশের সময় বিদ্যুৎ থাকায় সিসি টিভি ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে এবং জামিনে মুক্তির সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সিসি টিভি ফুটেজ সংরক্ষণ সম্ভব হয়নি।
এদিকে ঘটনার পরদিন শুক্রবার জেল সুপার মো. ওবায়দুর রহমান আদালতের জামিন/খালাস কার্যক্রম বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত কারারক্ষী মোরশেদ আলম, মো. হানিফ মিয়া, শাহাব উদ্দিন, রবিউল আলম মোহাম্মদ জাহিদ হাসান ও মোহাম্মদ আবু খায়েরকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। এরপর গত শনিবার কারা মহাপরিদর্শক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন এ ঘটনায় ডেপুটি জেলার আজহারুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করেন।
ঘটনার তদন্তে ওইদিনই কারা অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কারা উপ-মহাপরিদর্শক মো. ছগির মিয়াকে প্রধান করে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির অন্য দুই সদস্য ফেনী জেলা কারাগার-১ এর জেল সুপার মো. আবদুল জলিল ও চাঁদপুর জেলা কারাগারের ভারপ্রাপ্ত জেলার জুবাইর হোসেন। কমিটিকে আগামী ৩ কর্মদিবসের মধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিবেদন কারা অধিদপ্তরে পাঠাতে বলা হয়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসন থেকেও এ বিষয়ে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। যার প্রধান করা হয়েছে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাহমিনা আক্তারকে। তিনি বলেন, ‘এই কমিটি প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন ছাড়াও জেলখানার দুর্বলতাটা কোথায় সেটিসহ ৪টি বিষয় দেখবে। আগামী ৫ কার্য দিবসের মধ্যে এই কমিটি প্রতিবেদন দেবে।’