সোনালি স্বপ্ন পূরণের আশায় ২০২৩ সালের অক্টোবরে আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে গিয়েছিলেন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর মো. ইউসুফ রাজু। সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে দেশে রেখে যাওয়ার সময় স্বপ্ন ছিল, কাগজপত্রের প্রক্রিয়া শেষ করে দেশে ফিরবেন। পরে স্ত্রী ও সন্তানদেরও নিয়ে যাবেন নিজের কাছে। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না তার।
নিউইয়র্ক সিটির একটি রেস্তোরাঁয় দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হয়েছেন ইউসুফ রাজু। তার বাড়ি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী উপজেলার আমিশাপাড়া ইউনিয়নের কংশনগর গ্রামে। তার মৃত্যুর খবরে এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বাড়িতে স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা ও ভাই-বোনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।
কংশনগর গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ উল্লাহর তিন ছেলে ও তিন মেয়ের মধ্যে রাজু ছিলেন দ্বিতীয়। তার দুই মেয়ে—১২ বছর বয়সী জান্নাতুল নাঈমা ও আড়াই বছর বয়সী রাইসা। রাজু যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সময় তার স্ত্রী সন্তানসম্ভবা ছিলেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর ছোট মেয়ে রাইসার জন্ম হয়।
আমিশাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল আজিজ জানান, রাজু একসময় রঙের কাজ করতেন। এর আগে প্রায় তিন বছর কাতারে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার জন্য নিজের জমানো ১২ লাখ টাকার পাশাপাশি বিভিন্নজনের কাছ থেকে ৪৫ লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন। সেই ঋণের সিংহভাগ এখনো পরিশোধ করা হয়নি। এমনকি বাড়ির ভাঙা ঘরটিও মেরামত করা হয়নি।
আবদুল আজিজ বলেন, রাজুর এমন মৃত্যুতে তার পরিবারের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। স্বজন ও এলাকাবাসী অসহায় পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
রাজুর পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। দুই শিশু কন্যাকে নিয়ে কীভাবে সামনের দিনগুলো পার করবেন, সেই চিন্তায় রয়েছেন রাজুর স্ত্রী পলি আক্তার।
শনিবার দিবাগত রাত পৌনে ১২টার দিকে নিউইয়র্ক সিটির ব্রুকলিনের ইস্ট নিউইয়র্ক এলাকার ৮৪২ রকঅ্যাওয়ে অ্যাভিনিউয়ে অবস্থিত তার কর্মস্থল ‘আমেরিকান বেস্ট উইং’ রেস্তোরাঁয় গুলিতে নিহত হন রাজু। এ ঘটনায় তাঁর সহকর্মী মো. রাসেলও গুলিবিদ্ধ হন। তার বাড়ি কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার বিপুলাশার ইউনিয়নের বড়কাছি গ্রামে। তিনি ব্রুকডেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
রেস্টুরেন্টের মালিক, সহকর্মী, রুমমেট ও পরিচিতজনদের বরাতে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সাংবাদিক রুদ্র মাসুদ জানান, শনিবার রাতে রেস্তোরাঁয় কাজ করছিলেন রাজু ও রাসেল। এ সময় অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি অতর্কিত গুলি চালান। প্রথমে রাসেল পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরে রাজুকে গুলি করে পালিয়ে যায় ওই ব্যক্তি।
খবর পেয়ে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের (এনওয়াইপিডি) ৭৩তম প্রিসিংক্টের পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে দুজনকে উদ্ধার করে ব্রুকডেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাজুকে মৃত ঘোষণা করেন।
সহকর্মীরা জানান, রাজু ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে যান। আইন অনুযায়ী তিনি রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন এবং কাজ করার জন্য প্রয়োজনীয় বৈধ কাগজপত্র ছিল। ২০২৭ সালে তার মামলার চূড়ান্ত শুনানি হওয়ার কথা ছিল। কাগজপত্রের প্রক্রিয়া শেষ হলে দেশে ফেরার পরিকল্পনাও ছিল তার।
নিহত রাজুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও একই গ্রামের বাসিন্দা এবং রেস্তোরাঁর অন্যতম মালিক আবদুল জলিল শিপন জানান, খবর পেয়ে তিনি সঙ্গে সঙ্গে রেস্তোরাঁয় এবং পরে হাসপাতালে ছুটে যান। রাজু কিংবা অন্য কোনো স্টাফের সঙ্গে কারও পূর্ববিরোধ ছিল বলে তিনি জানেন না। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত শুরু করেছে। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ও রাজুর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন পুলিশ নিয়ে গেছে। রোববার রাত পর্যন্ত কাউকে আটক করার খবর তিনি পাননি।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মো. রাসেল জানান, তিনি চিকেনের ট্রে নিয়ে রান্নাঘর থেকে সামনে আসার সময় এক ব্যক্তি তাকে লক্ষ্য করে গুলি করেন। এতে তার ডান পায়ে গুলি লাগে। হামলাকারীকে যতটুকু দেখেছেন, তাতে তার কাছে ওই ব্যক্তিকে কৃষ্ণাঙ্গ যুবক বলে মনে হয়েছে। এরপর ওই ব্যক্তি রাজুকে গুলি করেন।
নিউইয়র্ক সিটির কুইন্সের ওজন পার্ক এলাকায় একটি ব্যাচেলর বাসায় থাকতেন ইউসুফ রাজু। অবসর সময়ে স্ত্রী ও মেয়েদের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতেন তিনি।
দি গ্রেটার নোয়াখালী সোসাইটি ইউএসএ ইনকের সভাপতি জাহিদ মিন্টু জানান, নিহত রাজু নোয়াখালী সোসাইটির সদস্য ছিলেন না। তবে তার মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে।