বিদেশে পাড়ি জমানোর স্বপ্ন নিয়ে চাঁদপুর কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে (টিটিসি) তিন দিনের প্রি-ডিপারচার ওরিয়েন্টেশন ক্লাসে অংশ নিতে আসা কর্মীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ব্যাচে ১০০ প্রশিক্ষণার্থী নেওয়ার কথা থাকলেও সেখানে ভর্তি করানো হচ্ছে ৪ শতাধিক প্রশিক্ষণার্থীকে। প্রতি ব্যাচে প্রতিদিন ৬ জন প্রশিক্ষক পাঠদান করানোর নিয়ম থাকলেও মাত্র ২ জন প্রশিক্ষক দিয়ে একটি কক্ষে সামলানো হয় চার শ প্রশিক্ষণার্থীদের।
সরজমিনে গিয়ে কথা হয় একাধিক প্রশিক্ষণার্থীরে সাথে। তারা জানান, এখানে সিট আছে ২০০, লোক আছে ৪০০ প্লাস, তাই বাইরে থেকে ক্লাস করতেছে সবাই। ভেতরে লোক আছে, বাইরে থেকে শুনছেন তারা।
প্রশিক্ষণার্থী রিফাত মজুমদার বলেন, ‘আমরা দাঁড়িয়ে রইছি, আমরা টাকা দিয়া এখানে ট্রেনিং নিতে আসছি, ঠিক আছে? কিন্তু আমরা সিট পাইতাছি না। এখানে লোক বসতে পারবে ২০০, স্যারেরা ভর্তি নিছে ১০০০ এর উপরে। আমরা এখন বাইরে দাঁড়িয়ে রইছি, কিছু নিচে আছে যারা হাঁটাউডা করতাছে, বসার সিট নাই। এই প্রশিক্ষণ কীভাবে কাজে আসবে? আমরা তো কোনো এখানে কথাই শুনতে পারতাছি না, আমরা সার্টিফিকেট দিয়ে কী করব? আমরা কিছু শিখতে পারতাছি না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক প্রশিক্ষণার্থী বলেন, ‘ যতটুকু বুঝি যে আমাদের তিন দিনের ট্রেনিংটা আমাদের খুবই প্রয়োজন। কিন্তু আমি আজকেসহ দ্বিতীয় দিন আসছি। আমি প্রথম দিনেও বসতে পারি নাই, আজকেও বসতে পারি নাই। বাইরে থেকে দাঁড়িয়ে ক্লাস শুনতে হচ্ছে আরকি। ঠিকমতো ক্লাসগুলো শুনতে পারতেছি না। ফলে এখানে কি শেখাচ্ছে সেটা পরিপূর্ণ শিখতে পারছি না।’
এখানে গিয়ে শুধু বসার সিট নয়, ওয়াশরুমের বেহাল দশা ও সুপেয় পানির সংকটসহ নানা অব্যবস্থাপনার কথাও তুলে ধরেন ক্ষুব্ধ প্রবাসগামীরা।
প্রশিক্ষণ নিতে আসা আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘এখন বাইরে আছি। আসছি তো ভেতরের ট্রেনিংয়ে, ভেতরে জায়গা নাই। এখন বাইরে পড়ছে। তো কত মানুষ জানা রইছে, সিট পায় নাই। কোনো চেয়ার নাই, রুমগুলো ছোট। ওয়াশরুমের অবস্থা বেশি ভালো না। এখানে মানুষের খুবই অবস্থা খারাপ বর্তমান। ওয়াশরুমে আমরা কালকে গেলাম, অবস্থা খুবই খারাপ। পানিটা আসে নাই ঠিক কইরা। আসে, তারপরও আস্তে আস্তে।’
একাধিকবার প্রবাসে যাওয়া আসা লোকমান বেপারী বলেন, ‘আসলে ট্রেনিং করার অনেক উপকার আছে। যারা নতুন তাদের জন্য অনেকটা জাস্ট অনেক কিছু শিখায়, অনেক কিছু দিক নির্দেশনা দেয়। জাস্ট কিভাবে চলবো, কীভাবে কী করবো, কোম্পানির সাথে কীভাবে আচরণ করবো, ডিউটি কীভাবে করবে, জাস্ট এগুলো অনেক কিছু শিখায়। এজন্য আসলে সবার জন্যই একটা উপকার এবং আগের জানাটা তো অনেক ইম্পর্ট্যান্ট, এজন্য বিদেশে যারা যায়, যারা যাইয়া অনেকটা ইজি হয়ে যায়।’
টানা চারদিন কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেল, কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ দরজা-জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ক্লাস করছে। আবার কেউ পুরো ক্যাম্পাসে, কেউ কেউ বাহিরে ঘোরাফেরা করছে।
তবে বাড়তি প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য কিছু চেয়ার ব্যবস্থা করার কথা বললেও অনেকেই বাতাস খেতে বাহিরে ছুটে যান বলে দাবি করেছেন অধ্যক্ষ শিরিন আক্তার।
তিনি আরও বলেন, ‘প্রশিক্ষণ ছাড়া সার্টিফিকেট নেওয়ার কোনো মূল্য আছে? না, না, না। এটা করে না। তাদের যে উদ্দেশ্য আসা, সেটা তো তাদের থাকতেই হবে, প্রশিক্ষণ তো তাদের নিতেই হবে।’
অধ্যক্ষ আরও বলেন, ‘লোকজনই মনে করে যে ভর্তি হইছি... ভর্তি হইছি এইটাই। যদি এমনি না আইসা সার্টিফিকেটটা পাই, উল্টো তারাই এইটা মনে করে। বললাম যে, তাদের ধরে রাখলেও তারা চলে যায়। এক ব্যাচে ১০০ জনের অনুমতি, আমি ইচ্ছা করলে ব্যাচ সংখ্যা বাড়াইতে পারি।’
এদিকে নির্ধারিত আসনের অতিরিক্ত প্রশিক্ষণার্থী ভর্তি বন্ধ করা না হলে সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত এবং বিদেশে গিয়ে সমস্যায় পড়েন কর্মীরা। বিষয়টি সরকারের প্রবাসী মন্ত্রণালয়ে কঠোর নজরদারি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে চাঁদপুরবাসী।
অন্যদিকে, মালয়েশিয়া যাওয়ার সরকারি প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে মানুষ দ্রুত যাওয়ার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়াতে প্রশিক্ষণে হঠাৎ চাপ বেড়েছে বলে দাবি জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিস।