লক্ষ্মীপুরে মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ৩ মাস, এখনো ধোঁয়াশা কারণ

লক্ষ্মীপুরে রায়পুরে মা ও তিন মেয়েকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনার তিন মাস পার হলেও খুনের কারণ এখনো ধোঁয়াশা রয়েছে। হত্যার রহস্য উদঘাটন করতে পারেনি পুলিশ। গত ২৫ জুন এই নৃশংস হত্যার ঘটনা ঘটে। অভিযুক্ত হত্যাকারীর মাদকাসক্তি, তাঁর সঙ্গে নিহত ব্যক্তিদের পূর্বপরিচয়, স্বর্ণালংকার লুট, অর্থ লেনদেন ও পূর্ববিরোধ–এখন পর্যন্ত সম্ভাব্য কারণ হিসেবে এগুলোই সামনে এসেছে। তবে কী কারণে এমন ঘটনা সেটা নিশ্চিত হতে পারেনি পুলিশ। ফলে এ নিয়ে চলছে নানান আলোচনা।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ঘটনাটির পেছনের কারণ অনুসন্ধানে কয়েকটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা আলামত, প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের বক্তব্যসহ বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করছে পুলিশ। সিআইডি ছায়া তদন্ত করলেও সামনে অগ্রসর হচ্ছে না।

স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, তদন্তে এখনো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। হত্যার সময় বাসার ভেতরে ঠিক কী ঘটেছিল, অভিযুক্ত ব্যক্তির লক্ষ্য একজন ছিলেন নাকি পুরো পরিবার, হত্যার আগে কোনো বাগ্‌বিতণ্ডা হয়েছিল কিনা কিংবা পূর্বপরিচয় থাকা সত্ত্বেও কেন এমন ভয়াবহ হামলা চালানো হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন তদন্তকারীরা।

রায়পুর বণিক সমিতির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এই নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো রায়পুরবাসীকে শোকাহত ও আতঙ্কিত করেছে। মানুষ জানতে চায়, কী কারণে এমন ঘটনা ঘটল। সেটা বের করতে হবে।’

নিহতদের পরিবারে বেঁচে থাকা একমাত্র সন্তান সিফাতের দাবি, তাঁর মায়ের কাছে কিছু স্বর্ণালংকার ছিল। সেগুলো লুট করার উদ্দেশ্যেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটতে পারে বলে তাঁদের সন্দেহ। তবে এ ঘটনায় আরও কেউ জড়িত ছিল কি না, সেটিও তদন্ত করে বের করার দাবি জানান।

ঘটনার কয়েকদিন পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে লক্ষ্মীপুর-২ (রায়পুর) আসনের সংসদ সদস্য আবুল খায়ের ভূঁইয়া বলেছিলেন, ‘সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে যা হবে, আমরা তা মেনে নেব। এর সঙ্গে যদি অন্য কেউ জড়িত থাকে, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে। এ ঘটনাকে পুঁজি করে কোনো ধরনের সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা করা যাবে না।’

এই ঘটনার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও রায়পুরে আতঙ্ক কাটেনি। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি এখনও চায়ের দোকান, বাজার, অলিগলি—সবখানেই ঘুরেফিরে আলোচনায় আসছে মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ঘটনা।

রায়পুর শহরের দেনায়েতপুর এলাকার বাসিন্দা ও শিক্ষার্থী মাহবুব বলেন, ঘটনার খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। ঘরের ভেতরে মা ও তিন মেয়ের রক্তাক্ত লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। সেই দৃশ্য এখনো তাঁর চোখে ভাসে। ঘটনার রাতে তিনি ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি।

লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) অরূপ রায় বলেছেন, প্রাথমিকভাবে ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। নিহত চারজনের শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

এদিকে মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ঘটনায় রায়পুর থানায় পৃথক দুটি হত্যা মামলা হয়েছে। নিহত শাহিনুর বেগমের ছেলে জুনায়েদ ইসলাম বাদী হয়ে মামলাটি করেন। অন্যটি চার পুলিশ আহত ও ঘাতককে পিটিয়ে হত্যা মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও রায়পুর থানার ইন্সফেক্টর (তদন্ত-ওসি) আবদুল মান্নান বলেছেন, প্রাথমিকভাবে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্বর্ণালংকার চুরি এবং আরও কয়েকটি বিষয় সামনে এসেছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি মাদকাসক্ত ছিলেন বলেও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে হত্যার কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কিছু বলা সম্ভব নয়। তদন্ত চলমান।

চলতি বছরের ২৫ জুন সকালে রায়পুর শহরের ধানহাটা এলাকার ডাকাতিয়া নদীর পাড়ের পাঁচতলা ভবনের নিচতলা ভাড়া বাসায় এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে নিহত হন গৃহিণী শাহিনুর বেগম (৪০) এবং তাঁর তিন মেয়ে কলেজপড়ুয়া সাইমা আক্তার (২১), ইকরা বেগম (১৭) ও স্কুলপড়ুয়া সিপা আক্তার (১০)। তাঁদের বাড়ি কুমিল্লার হোমনা উপজেলায়। নিহতরা দীর্ঘদিন পরিবার রায়পুরে ভাড়া বাসায় বসবাস করছে। ঘটনার পর পালানোর সময় অভিযুক্ত অন্তর মজুমদারকে স্থানীয় লোকজন আটক করে ছাদ থেকে নামিয়ে চরম গণপিটুনি দেন। পরে লক্ষ্মীপুর সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। অন্তরের বাড়ি নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলায়। তাঁর বাবার নাম কার্তিক মজুমদার। এদিকে-খুন হওয়া মা ও তিন মেয়ের দুই দফা জানাজা শেষে কুমিল্লার হোমনা উপজেলার লটিয়া নিজ গ্রামের সামাজিক কবরস্থানে পাশাপাশি ৪টি কবরে দাফন করা হয়।