ধানখেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন

প্রাণ বাঁচাতে বাবাকে লাইভ লোকেশন পাঠিয়েছিল তাজমিন

কুমিল্লা–নোয়াখালী মহাসড়ক সংলগ্ন লালমাই উপজেলার জগৎপুর মাইনি মুড়া জঙ্গল এলাকার ধানখেতে বৃহস্পতিবার ভোরে ১৫ বছর বয়সী জান্নাতুল তাজমিনের লাশ পাওয়া যায়। ঘটনাস্থলের আশেপাশের ধানখেতজুড়ে ছিল ধস্তাধস্তির চিহ্ন। কিছুটা দূরে রাস্তার পাশেই ধানখেত থেকে জব্দ করা হয় একটি সিএনজি।  

সরেজমিনে গিয়ে সেখানে দেখা গেছে, ঘটনাস্থলের আশেপাশের ধানখেতজুড়ে যেন ধস্তাধস্তির চিহ্ন। উঠতি ধানের চারাগুলোকে এমনভাবে মাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যেন কেউ এর ওপর দিয়ে ছোটাছুটি করেছে। 

স্থানীয়দের ধারণা, তাজমিন ঘাতকের হাত থেকে বাঁচতে গিয়ে ছোটাছুটি করেছে ধানখেতে। জগৎপুর গ্রামের ওই সড়কের দুই পাশের ধানখেতেই এরকম চিহ্নে যেন ফুটে উঠেছে তাজমিনের প্রাণে বাঁচার শেষ লড়াইটুকু। সেখান থেকে উদ্ধার হয় একটি ভ্যানিটি ব্যাগও, উদ্ধার হওয়ার জামার অংশ বিশেষ দেখেই নিজের মেয়ে তানজিমের বলে শনাক্ত করেন তার বাবা আব্দুল আলীম। 

বৃহস্পতিবার বিকেলে ওই এলাকায় কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সকালবেলা ধানখেত দেখে মনে হয়েছে সেখানে কেউ ধস্তাধস্তি করেছে। আমরা এসে দেখলাম মেয়েটার মাথা কাদার নিচে। শরীরটা কাদার নিচে ছিল। শুধু পিঠটুকু দেখা গেছে। মুরুব্বিরা ধরতে নিষেধ করেছে তাই আমরা কাছে যাইনি। একটু দূরেই সিএনজিটা পড়েছিল।’

ভোরবেলা যখন লাশ উদ্ধার হয় তখন সেখানে ছিলেন একই এলাকার মো. হাসান। তিনি বলেন, ‘এসে দেখি সিএনজিটা উল্টে আছে রাস্তার পাশে। তারপর আমরা জনগণ এটাকে উঠাই। এর এক ঘণ্টা পর আমরা বুঝতে পারলাম পাশের খেতে একটি মেয়ে পড়ে আছে। এরপর আমরা ৯৯৯ নম্বরে কল দেই। এরপর পুলিশ আসে লাশ উদ্ধার করে নিয়ে যায়।  মেয়েটির গলায় দড়ির মত কিছু দিয়ে বাধা ছিল। আর তার শরীরটা উপুর করা ছিল।’ 

তাজমিনকে উদ্ধারের এমন রোমহর্ষক বর্ণনা দেয় এলাকাবাসী।  তাদের কেউই যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না সেখান থেকে একটি মেয়ের লাশ উদ্ধার হয়েছে। ভোরবেলা লাশ উদ্ধারের পর বিকেলে যখন তানজিমের বাড়ি থেকে বের হওয়ার ঘটনা এলাকাবাসী শুনেন তখন তারা আরও বেশি অবাক হন। 

জান্নাতুল তাজমিন কুমিল্লার ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিল। যদিও সে ক্লাসে অনিয়মিত ছিল। সে পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লা শহরের রেসকোর্স ধানমন্ডি এলাকায় থাকত। তার বাবা আব্দুল আলীম একটি বেসরকারি ঔষধ কোম্পানির কর্মকর্তা। তাদের গ্রামের বাড়ি  যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা। 

বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগতপুর উত্তরপাড়ার মানুমুড়া জঙ্গল সংলগ্ন ফসলি জমি থেকে ওই তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করে লালমাই থানা পুলিশ। মরদেহের পাশ থেকে কুমিল্লা থ-১৩-০১১৪ নম্বরের একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।

তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম বলেন, ‘৪ তারিখ বান্ধবীর বাসায় যাবে বলে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এর মধ্যে বিভিন্ন সময় তার ফোনে যোগাযোগ করা হলে সে বান্ধবীরা বাসায় আছে বলে জানায়। গতকাল রাতে সে আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে মেসেজ পাঠায় এবং লাইভ লোকেশন পাঠায়। সেখানে সে জানায় তাকে এসে নিয়ে যাবার জন্য। তখন আমি ঘুমে ছিলাম। পরে ভোরবেলা যখন মেসেজ দেখি তারপর লাইভ লোকেশনে এসে মেয়ের মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে দেখতে পাই।’ 

সদর দক্ষিণ সার্কেল সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লা ফেরদৌস বলেন, ‘৪ অক্টোবর কুমিল্লা শহরেই বান্ধবীর বাসায় যাবার কথা বলে জান্নাত বের হয়। কিন্তু পুলিশের তদন্তে এসেছে, সেদিন জান্নাত ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় যায়। ৫ তারিখ কুমিল্লায় ফেরে। আবার ভোররাতে কক্সবাজার যায়। ৭ তারিখ দুপুর সাড়ে ১২টায় সেখান থেকে রওনা হয়ে সাড়ে ১০টায় কুমিল্লা পদুয়ার বাজার নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে। এরপর যোগাযোগ বন্ধ। সিএনজিতে ভ্যানিটি ব্যাগ ও জামা পাওয়া গেছে। বাবা জামা দেখে সেটি জান্নাতের বলে শনাক্ত করেছেন। ধারণা করা হচ্ছে তাকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছে।’ 

লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে জানান, মরদেহটি প্রথমে অজ্ঞাত ছিল। পরে পরিচয় শনাক্ত করা হয়েছে। নিহত কিশোরীর বয়স আনুমানিক ১৫ বছর। তার গলায় গামছা পেছানো ছিল। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।