দুই সন্তানের আবদার মেটাতে রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন পপি রাণী। বেইলি রোডের ভয়াবহ আগুনে তাঁর সঙ্গে মারা গেছে দুই সন্তানও। মধ্যরাতে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি বিভাগের সামনে আহাজারি করছিলেন পরিবারটির সদস্যরা। দুই সন্তান ও স্ত্রীকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ শিপন পোদ্দার।
বৃহস্পতিবার রাতে বহুতল ভবনটিতে লাগা ভয়াবহ আগুনে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ জনে। ফায়ার সার্ভিসের ১৩ ইউনিটের চেষ্টায় দুই ঘন্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও পুড়ে গেছে বাণিজ্যিক ভবনটি।
ওইদিন আটটার দিকে গ্রিন কোজি নামের এই ভবনের একটি রেস্তোরাঁয় খেতে যান শিপন পোদ্দারের স্ত্রী পপি রানী। সঙ্গে ছিল সাত বছর বয়সী ছেলে সংকল্প ও তেরো বছর বয়সী মেয়ে সম্পূর্ণা।
শিপন পোদ্দার বলেন, ‘ওরা যখন ওখানে গেছে তখনই আগুন লেগেছে। আমাকে ফোন দিয়েছে। আমি ঢাকার বাহিরে ছিলাম। যখন শান্তিনগর মোড়ে আসলাম তখন আর কেউ ফোন ধরছিল না।’
রাত পৌনে দশটার দিকে গাড়ি চালক মোশাররফ হোসেনকে ফোন দিয়ে বাঁচার আকুতি জানান পপি রানী। কথা বলতে বলতেই নিস্তেজ হয় যায় তার কণ্ঠ।
মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘অন্য জায়গায় যাওয়ার পথেই আমাকে ফোন দেয় যে আমরা আটকা পড়েছি আগুনে। কোথায় লেগেছে? বলে যে রেস্টুরেন্টের নিচে থেকে আগুন আসছে। তখন তাদের বলা হয়েছে যে, আপনারা উপরে চলে যান ছাদের দিকে। ছেলে, মেয়ে, মা তিনজনের কেউই আর থাকল না।’
একই পরিবারের তিনজনকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ স্বজনেরা। তাঁরা বলছেন, এমন মৃত্যু যেন আর কারো না হয়।
ঢাকা মেডিকেলের জরুরী বিভাগের সামনে পপি রানীর এক স্বজন বলেন, ‘আমি ১০টার দিকে খবর পেয়েছি। ভাইয়ের শাশুড়ি ফোন করেছে যে, বেইলি রোডে আগুন লেগেছে। ওরা ওখানে গেছে। আটকা পড়েছে। তখন থেকেই শুধু চারিদিকে ফোন দিয়ে খবর নিচ্ছি। কাচ্চি ভাইয়ে রাতের ডিনার শেষ করে আসবে। ওরা শান্তিবাগে থাকে। ছেলে মেয়েদের নিয়ে গেছে। বলেছে যে খেয়েই বাসায় ফিরব।’
স্বজন হারিয়ে কাঁদছেন জিহাদ জোয়ার্দার। তাঁর মামা কামরুল হাসান রকি ছিলেন কাচ্চি ভাই-এর ক্যাশিয়ার।
ঢাকা মেডিকেলের মর্গের সামনে আহাজারি দেখা গেছে বেইলী রোডের আগুনে প্রাণ হারানো আরও অনেকের স্বজনের।
বেইলি রোডে ভবনে আগুনের ঘটনায় উদ্ধার হওয়া ৭৫ জনের মধ্যে মারা যান প্রায় অর্ধশত। নিহতদের মধ্যে ২৩ জনের মরদেহ এখন পর্যন্ত পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। দগ্ধ হয়ে শেখ হাসিনা বার্ন ইন্সটিটিউট ও ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি আরও অন্তত ২৫ জন। যাদের বেশিরভাগেরই পুড়ে গেছে শ্বাসনালী।
বেইলে রোডের গ্রিন কোজি কটেজ ভবনে রাত পৌনে ১০টায় দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে থাকে। ৯টা ৫৬ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসের ৬টি ইউনিট কাজ শুরু করে। একে একে যোগ দেয় ১৩টি ইউনিট।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পান তারা। মূহুর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো ভবনে।
প্রথম দুই ঘণ্টা কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে রাত ১২টার পর থেকে আহত ব্যক্তিদের ভবন থেকে বের করে আনা হয়।
ফায়ার সার্ভিস বলছে, পুরো ভবনে অসংখ্য গ্যাস সিলিন্ডার মজুত ছিল। এমনকি সিঁড়িতেও মজুত ছিল সিলিন্ডার। ফলে ভবনটিতে আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে তা দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে।
ভবনটিতে পর্যাপ্ত অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা ছিল না বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ভিডিও দেখুন:ভবনটিতে কাচ্চি ভাই, পিৎজা ইন, স্ট্রিট ওভেন, খানাসসহ বেশ কয়েকটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে। এছাড়া ইলিয়েন, ক্লোজেস্ট ক্লাউডসহ বেশকিছু জনপ্রিয় পোশাকের দোকানও রয়েছে।
ঘটনা তদন্তে এরই মধ্যে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে ফায়ার সার্ভিস।