‘সবকিছু ফেলে না দিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন হতে পারে’ 

ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান সংশোধনে কমিশন গঠন করেছে। অনেকে আবার সংবিধান পুনর্লিখনের দাবি তুলেছেন। কিন্তু এই সরকারের সংবিধান সংশোধনের ম্যান্ডেট আছে কি না, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন। কেউ কেউ বলছেন, সবকিছু ফেলে না দিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধন হতে পারে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড এন্ড সার্ভিসেস (ব্লাস্ট) ও বাঙলার পাঠশালা আয়োজিত আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।  
 
আইনজীবী শরিফ আহমেদ ভুঁইয়া জানান, সংবিধান সংশোধন বা পুনর্লিখনের চেয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো ঠিকঠাক কাজ করছে কি না, তা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এই সরকার নির্বাচিত নয়। সে কারণে তিনি মনে করেন, সংবিধান সংশোধন বা পুনর্লিখনের ম্যান্ডেট তাদের নেই। বড়জোর এই সরকার সেই প্রক্রিয়া শুরু করে দিতে পারে। তবে মৌলিক পরিবর্তন করতে হলে জনমত গঠন করতে হবে বলে মত দেন শরিফ। তাঁর পরামর্শ, এই সরকারের উচিত, ফাংশনাল সংশোধনের মধ্যে সীমিত থাকা।

ব্যারিস্টার মুস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, ‘এই ছাত্র-জনতার আন্দোলনে কি সংবিধান সংশোধনের দাবি ছিল, যদি তা না থাকে, তাহলে এখন এই উদ্যোগ কেন। এর আগে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সাহাবউদ্দিন আহমেদের সরকারের সময় এমন দাবি উঠেছিল; কিন্তু তখন তাঁরা সেটা করেনি।’
 
মুস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, ‘কী প্রক্রিয়ায় সংশোধন হবে, তা গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধান সভার মাধ্যমে হতে পারে; আবার আলোচনার মাধ্যমে হতে পারে। কিন্তু আলোচনার মাধ্যমে হলে জামায়াতে ইসলামী ও হেফাজতে ইসলামের মতো দল তাতে অংশগ্রহণ করবে; এর মধ্য দিয়ে তাঁরা মূল ধারায় চলে আসার সুযোগ পাবে।’

অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম বলেন, ‘পরিস্থিতি এমন জায়গায় আছে যে শুধু সংশোধন করলে হবে না, পুনর্লিখনও করতে হবে। বিশেষ করে নির্বাহী বিভাগের কাঠামো বিবর্তনের পরামর্শ দেন তিনি। ১০৬ নম্বর ধারার মতো কিছু বিষয়ের স্পষ্টীকরণ দরকার। সেই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নির্বাহী বিভাগ দেবে, বিষয়টি এমন নয়; বরং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অন্তর্নিহিত।’ 
 
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন আইনজীবী সারা হোসেন। তিনি বলেন, ‘আগের সবকিছু ফেলে দিতে হবে, এমন মনে করার কারণ নেই। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা এই দেশ ও সংবিধান পেয়েছি, তখনকার মানুষের কিছু চিন্তা ছিল, তার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে। এসব কিছুই আমাদের ইতিহাস, গর্ব করার অনেক কিছুই আমাদের আছে। 
কিছু কিছু অর্জন আমাদের আছে, তা ভুলুণ্ঠিত হতে দেওয়া যাবে না। ইদানীং অনেক জায়গায় নারীদের প্রতিনিধিত্ব দেখা যায় না, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। নারী-পুরুষের সমানাধিকার আমাদের সংবিধানে প্রতিষ্ঠিত, সেখান থেকে আমরা পিছিয়ে আসতে পারি না।’
 
সারা হোসেন আরও বলেন, ‘এখন আলোচনার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কিন্তু এখন আমাদের অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে, এই সময় ঠিক কী কী করতে হবে। ১৮ জুলাই থেকে মোটামুটি আমরা সবাই বুঝেছি, কী হওয়া দরকার বা কী নয়। ৫ আগস্টের পর সেই ঐকমত্য অতটা নেই। কিন্তু জুলাই-আগস্টের সেইে চেতান আমাদের ধরে রাখতে হবে। যে অবিচার অন্যায় হয়েছে, তার বিচার করা এখন আমাদের অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।’
 
অনুষ্ঠানে বক্তারা সংবিধানের আরও অনেক বিষয়ে আলোচনা করেন। নির্বাচন নিয়েও আলোচনা হয়। অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইকরামুল হক, নাবিলা ফারহিন, ড. কাজী জাহেদ ইকবাল প্রমুখ।