একযুগে তালাশ 

‘প্রায় প্রত্যেক পর্বেই হুমকির শিকার হয়েছি’

বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় অনুসন্ধানমুলক ক্রাইম শো ‘তালাশ’। একযুগেরও বেশি সময়ের পথচলায় তালাশ প্রায় ২৭৪টি পর্ব শেষ করেছে। তালাশের এই অবিরাম পথচলার অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন অনুষ্ঠানটির উপস্থাপক ও ইনচার্জ আব্দুল্লা আল রাফি।

তালাশ একযুগ শেষ করল। এই দীর্ঘ পথচলায় আপনাদের অর্জন কি?
আব্দুল্লা আল রাফি: দেখতে দেখতে তালাশ একযুগ অতিক্রম করেছে। এই দীর্ঘ পথ চলায় তালাশের অর্জন অনেক। বাংলাদেশের সরকারি‑বেসরকারি যত পুরস্কার রয়েছে, তালাশের ঝুলিতে এর সবগুলোই আছে। তার চেয়েও বড় অর্জন হলো, সারা দেশের মানুষের কাছে তালাশের পরিচিতি। জনপ্রিয়তা যেমন আছে, তেমনি আমাদের কাছে মানুষের প্রত্যাশারও শেষ নেই । 

এই একযুগে কয়টি পর্ব প্রচার হয়েছে? কোন কোন বিষয়গুলোকে আপনারা গুরুত্ব দিয়েছেন?
আব্দুল্লা আল রাফি: এখন পর্যন্ত ২৭০টিরও বেশি পর্ব করেছি। অর্থাৎ, ২৭০টি বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করেছি। ব্যক্তিগত দুর্নীতি, সংঘবদ্ধ অপরাধ, স্থানীয় সমস্যা, অভিবাসী সমস্যাসহ নানা অনিয়ম নিয়ে তালাশ অনুসন্ধান করেছে। 

নিশ্চয় এই যাত্রাটা সহজ ছিল না। কেমন ছিল আসলে?
আব্দুল্লা আল রাফি: এ যাত্রায় সফলতা যেমন ছিল, তেমনি প্রতিকুল পথও পাড়ি দিতে হয়েছে। তালাশে আমার পূর্বসূরিদের অবদান অনেক। তাদের ত্যাগ তালাশকে আরও মহিমান্বিত করেছে। তালাশের সহকর্মীরাই মূলত দেশের অন্যান্য টেলিভিশনের ক্রাইম শোগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মানহানির মামলা, আইসিটি আইনের মামলা, ফোনে হুমকি‑ধামকি, রাষ্ট্রের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বিধি‑নিষেধ আরোপ–এসব কিছু মোকাবিলা করে তবেই আমাদের কাজ করতে হয়। 

একযুগেরও বেশি সময়ের পথচলায় তালাশ প্রায় ২৭৪টি পর্ব শেষ করেছে। ফাইল ছবি

যাদের মুখোশ খুলেছেন, তারাও তো বিরাজভাজন হয়েছে। এমন কি হামলা-মামলার ঘটনাও ঘটেছে। দু‑একটি ঘটনার পেছনের গল্প শুনতে চাই। 
আব্দুল্লা আল রাফি: প্রায় প্রত্যেক পর্বেই আমরা কোনো না কোনোভাবে ভয়‑ভীতি বা হুমকির শিকার হয়েছি। যেমন ধরুন, আমরা কক্সবাজারের পর্যটন শিল্প নিয়ে কাজ করতে গিয়েছি। সেখানে আবাসিক হোটেলের অব্যবস্থাপনা, মাদকসহ বিভিন্ন অনৈতিক বিষয় আমাদের অনুসন্ধানে তুলে এনেছি। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের ওপর হামলা হয়, এমনকি একাধিক মামলাও হয়। এখনও সেই মামলাগুলো চলমান।

তালাশের সদস্য সংখ্যা কত? আপনারা কীভাবে এই কঠিন কাজগুলো করেন?
আব্দুল্লা আল রাফি: তালাশে সরাসরি ১০ জন সদস্য কাজ করেন। এ ছাড়া আরও ৫ থেকে ৬ জন আমাদের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করেন। আমাদের টিমের সদস্যরা ডেডিকেটেডভাবে তাদের অনুসন্ধান পরিচালনা করে। সব বাধা, বিপত্তি, ভয়‑ভীতি উপেক্ষা করেই আমরা কাজ করি।

অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে কি কোনো প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে?
আব্দুল্লা আল রাফি: প্রত্যেক দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিরই নিজস্ব ব্যাখ্যা আছে, যে সে দুর্নীতি করে নাই। রাষ্ট্রের বড় বড় পর্যায়ে তাদের লোক আছে। সুতরাং কাজ শুরু করতে গেলেই বিভিন্নভাবে বাধা আসে। সেজন্য আমরা অনেক সময় নানা কৌশল বেছে নিই। 

ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের নিয়ে আপনারা নানা অনুসন্ধান করেছেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও বাদ যাননি। তাদের দুর্নীতি অনুসন্ধান করা কতটা কঠিন ছিল?
আব্দুল্লা আল রাফি: আমরা এসব চ্যালেঞ্জ নিয়ে সব সময় প্রস্তুত থাকি। ভিআইপি দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে আমরা প্রমাণের ওপরই বেশি নজর দিই। কোনো একটি বিষয়ের যদি প্রমাণের কোনো ঘাটতি থাকে, সেটির ওপর তারা বেশি গুরুত্ব দিয়ে আমাদের দুর্বল ভাবা শুরু করে। সুতরাং কোনো ধরনের সন্দেহের অবকাশ রেখে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করা যায় না। অবশ্য আমরা সব ক্ষেত্রেই যে সফল হয়েছি, তা নয়। আমাদেরও অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। তবে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। 

তালাশে কাজ করতে গিয়ে কখনো আইন‑শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সহায়তা পেয়েছেন কি?
আব্দুল্লা আল রাফি: অবশ্যই পেয়েছি। আবার উল্টো ঘটনাও আছে। তাই আমরা কারও সাহায্যের আশায় না থেকে অত্যন্ত গোপনে কাজ করি। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে যেমন দুর্নীতিবাজদের খোঁজ‑খবর নিতে তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা, আমরা ক্ষেত্রবিশেষে রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে নিয়ে থাকি।

একটা সাধারণ অভিযোগ আছে, বাংলাদেশের সাংবাদিকরা বা যারা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা করেন, তাঁরা বিভিন্নভাবে প্রভাবিত হন। আসলেই কি তাই?
আব্দুল্লা আল রাফি: সবকিছুরই একটা পজিটিভ ও নেগেটিভ দিক আছে। ধরুন, আমরা কোনো একটি বিষয় নিয়ে কাজ করছি। এর একপর্যায়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কোনো জায়গা থেকে বলা হলো, পর্বটি প্রচার করা যাবে না। তখন আমাদের কিন্তু কিছুই করার থাকে না। দর্শক বা যারা ভেতরের খবরগুলো জানেন না, তাঁরা কিন্তু ধরেই নেন যে, তালাশ মনে হয় প্রভাবিত হয়েছে। 

তালাশ একটি জনপ্রিয় অনুসন্ধানমূলক অনুষ্ঠান। এই জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে বিভিন্ন স্থানে তালাশের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া একই ধরনের লোগো বা নাম ব্যবহার করার অভিযোগও আছে। এই বিষয়গুলো কি আপনাদের বিতর্কিত করে?
আব্দুল্লা আল রাফি: জনপ্রিয়তার কারণে অনেক প্রতারক তালাশের লোগো নকল করে, ভুয়া প্রেসকার্ড বানিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ও জনপ্রতিনিধিদের ভয়‑ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায় করে–এমন অভিযোগ রয়েছে। আমরা এগুলো নিয়ে সচেতনতা বাড়াতে সতর্কতামূলক ৩ থেকে ৪টি পর্ব করেছি। কিন্তু কোনোভাবেই এসব প্রতারকদের থামানো যাচ্ছে না। আমরা অনেক জিডিও করেছি এদের বিরুদ্ধে। তবে আমরা মনে করি এ‑সংক্রান্ত বিষয়গুলোতে ভুক্তভোগীদের আইন‑শৃঙ্খলা বাহিনীর সহাযোগিতা নেওয়া উচিত। আমাদের অনুরোধ–প্রতারণার ফাঁদে কেউ পা দেবেন না।