‘আমার দুই সন্তান তাদের বাবাকে ছাড়া এক রাতও ঘুমায়নি। যত রাতই হতো তাদের বাবা কাজ শেষ করে বাসায় এলে সন্তানদের বুকে নিয়ে শুইলেই ঘুমিয়ে যেত। রোববার রাতে তাদের বাবাকে না পেয়ে সারারাত ছটফট করেছে। ওরা তো এখনো ছোট কিছু বুঝতে বা বলতে পারে না, বাবাকে শুধু খুঁজে। এখন কাকে নিয়ে আমার সন্তান ঘুমাবে। আমার মানিক (স্বামী) নিজেই তো আমাদের একা রেখে চিরদিনের জন্য ঘুমিয়ে গেছে।’— এভাবেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন মেট্রোরেল পিলারের বিয়ারিং প্যাড মাথায় পড়ে প্রাণ হারানো আবুল কালাম আজাদের স্ত্রী আইরিন আক্তার প্রিয়া।
প্রিয়া বলেন, ‘সরকারকে বলেন আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দিতে। তাদের কারণেই তো আমার স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। তারা যদি মেট্রোরেলের পিলারের বিয়ারিং প্যাড ঠিকমতো লাগাত তাহলে তো আমার স্বামী এই দুর্ঘটনায় মারা যেত না। আমার অবুঝ শিশু সন্তানরা-বাবাহারা আর আমি স্বামীহারা হতাম না। আজাদ আমার সন্তানদের নিয়ে প্রতিদিন ঘুরতে বের হতো, তাদের পছন্দের খাবার কিনে খাওয়াতো ও খেলনা কিনে দিত। এখন কে দেখবে আমার সন্তানদের? এখন আমি দুই সন্তানকে নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে আছি।’
তিনি বলেন, ‘আর যেন এমন ঘটনা না ঘটে। যাদের উদাসীনতায় আমার স্বামীর মৃত্যু হলো তাদের সঠিকভাবে বিচার হোক।’
আবুল কালাম আজাদের মৃত্যুতে দিশেহারা পরিবার। তাঁর দুইটি ছোট্ট সন্তান নিয়ে পাগলপ্রায় স্বামীহারা স্ত্রী। অন্যদিকে বাবা-মা হারা নয় ভাই-বোনের মধ্যে সবার ছোট আবুল কালাম আজাদকে হারিয়ে কান্না থামছেই না পরিবারের সদস্যদের। দুর্ঘটনায় জন্য মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকেই দুষছেন নিহতের স্বজন ও এলাকাবাসী। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ ও দোষীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
পরিবার ও স্থানীয়রা জানায়, রাজধানী ফার্মগেটে মেট্রোরেল পিলারের বিয়ারিং প্যাড মাথায় পড়ে নিহত আবুল কালাম আজাদকে রোববার রাত ১টার দিকে আনা হয় শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলা মোক্তারের চর ইউনিয়নের ঈশ্বরকাঠি গ্রামের বাড়িতে। আজ সোমবার সকাল ৯টার দিকে মোক্তারের চর পূর্ব পোড়াগাছা ইসলামিয়া দাখিল মাদরাসা মাঠে জানাজা শেষে নড়িয়া বাজার জামে মসজিদের গণকবরস্থানে দাফন সম্পন্ন হয় তাঁর।
কিশোর বয়সে বাবা-মাকে হারিয়েছিলেন আবুল কালাম আজাদ। এরপর ভাই-বোনদের সংসারে বেড়ে ওঠেন। কঠোর পরিশ্রম করে সংসারের সচ্ছলতা ফেরাতে চেষ্টা করছিলেন। পরিবারের প্রিয় মানুষটি মাত্র ৩৫ বছর বয়সে মারা গেছেন। আজাদ শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার মোক্তারের চর ইউনিয়নের ঈশ্বরকাঠি গ্রামের জলিল চোকদার ও হনুফা বেগম দম্পতির ছেলে। ঈশ্বরকাঠি গ্রামের জন্ম নেওয়া আজাদ ছয় বোন আর তিন ভাইয়ের মাঝে সবার ছোট । ২০ বছর আগে তাঁর বাবা ও মা মারা যান। এরপর তিনি বড় হন বড় ভাই ও বোনদের কাছে। তাঁর এমন অকালমৃত্যু মানতে পারছেন না স্বজন ও গ্রামের মানুষেরা।
সংসারের স্বাচ্ছন্দ্য ফেরাতে ২০১২ সালে মালয়েশিয়ায় যান আবুল কালাম। সেখান থেকে ফিরে ২০১৮ সালে পাশের গ্রামের আইরিন আক্তার প্রিয়াকে বিয়ে করেন। দাম্পত্য জীবনে তাঁদের চার বছরের এক ছেলে আব্দুল্লাহ ও আর আড়াই বছর বয়সী এক মেয়ে আরিশা। স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান নিয়ে আবুল কালাম নারায়ণগঞ্জের পাঠানটুলী এলাকায় বসবাস করতেন। ঢাকার মতিঝিলের একটি ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে কাজ করতেন। ওই কাজের জন্যই প্রতিদিন তিনি নারায়ণগঞ্জ–ঢাকা যাতায়াত করতেন।
প্রতিদিনের মতো রোববার সকালে নারায়ণগঞ্জ থেকে মতিঝিলে আসেন আবুল কালাম। এরপর কাজের জন্য সেখান থেকে বের হন। দুপুর সোয়া ১২টার দিকে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় মেট্রোরেলের পিলারের বিয়ারিং প্যাড খুলে পড়ে যায়। সেটির নিচে চাপা পড়ে প্রাণ হারান আবুল কালাম। এরপর গণমাধ্যমের সংবাদে পরিবারের সদস্যরা তাঁর মৃত্যুর খবর জানতে পারেন।
নিহতের বাল্যবন্ধু রিহানুজ্জামান বলেন, ‘আগের রাতে আজাদের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল। বলেছিল, ভালো আছি। সেই মানুষটা আজ আর নেই। এই মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। আল্লাহ বন্ধুকে জান্নাত দান করুক।’
নিহতের চাচাতো ভাই আব্দুল গনি মিয়া চোকদার বলেন, ‘এত আধুনিক প্রজেক্টে যদি এমন নিরাপত্তা বিপর্যয় হয়, তাহলে আমাদের নিরাপত্তা কোথায়? যারা দায়িত্বে আছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। আর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানাই।’
শরীয়তপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. ইমরুল হাসান বলেন, ‘আবুল কালাম আজাদের মৃত্যুতে আমরা সবাই ব্যথিত। আমরা জেলা ও উপজেলা প্রশাসন আবুল কালাম আজাদের পরিবারের পাশে আছি। তাঁর পারিবারকে সহযোগিতা করা হবে।’