ডিভোর্সি নারীকে বিয়ে করায় সালিসে যুবককে জরিমানার পর গ্রামছাড়া

শরীয়তপুরের জাজিরায় ডিভোর্সি নারীকে বিয়ে করায় এক যুবককে সালিসে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা ও গ্রামছাড়া করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় প্রভাবশালী ও সালিসদের ভয়ে গত নয় দিন ধরে গ্রামছাড়া ওই যুবক। এ ঘটনায় বিচার চেয়ে জাজিরা থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন তিনি।

ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার বড়কান্দি ইউনিয়নের মনাই ছৈয়ালকান্দি গ্রামে। ভুক্তভোগী যুবকের নাম রতন সরদার। তিনি ওই গ্রামের মৃত রাজ্জাক সরদারের ছেলে।

থানায় দেওয়া অভিযোগ, সালিস ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, একই গ্রামের রুবেল শিকদারের সঙ্গে রতন সরদারের বন্ধুত্ব ছিল। পারিবারিক কলহের জেরে ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর রুবেল তার স্ত্রী রুবিনা আক্তারকে ডিভোর্স দেন। পরে গত ৩ আগস্ট রুবিনাকে বিয়ে করেন রতন সরদার।

বিয়ের পর থেকেই রুবেল ও তার লোকজন রতনের বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগ তুলে তাকে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ রতনের।

এর ধারাবাহিকতায় গত ৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় মনাই ছৈয়ালকান্দি এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য মতিউর রহমান খানের বাড়ির উঠানে সালিস বৈঠক বসে। সেখানে পাঁচ শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিল বলে জানা গেছে।

সালিসে রতনের বিরুদ্ধে পরকীয়াসহ কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেছেন সালিসে থাকা কয়েকজন। এরপরও তাকে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে ৯ সেপ্টেম্বর সূর্য ওঠার আগে তাকে গ্রাম ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

রতনের অভিযোগ, সালিসের লোকজন ভয়ভীতি দেখিয়ে তার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়েছেন। এছাড়া রুবেলের পরিবারের কাছে তার জমি বন্ধক রাখার এক লাখ টাকা কেটে নেওয়া হয়েছে। বাকি ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা এক মাসের মধ্যে তিন কিস্তিতে পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রতনের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালী জাহাঙ্গীর শিকদার, রুবেল শিকদার, সোহেল শিকদার, দিহান শিকদার এবং সালিশে থাকা জাজিরা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আলী আশরাফ মাল, সাংগঠনিক সম্পাদক মোশারফ বেপারী, বড়কান্দি ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সহসভাপতি রাজ্জাক শেখ, সদস্য মতিউর রহমান খান, সদস্য লতিফ খান ও রাজ্জাক বেপারীসহ কয়েকজনের ভয়ে তিনি নয় দিন ধরে গ্রামছাড়া।

সালিশে থাকা জাজিরা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মোশারফ বেপারী বলেন, ‘পরকীয়ার প্রমাণসহ কোনো অপরাধই রতনের বিরুদ্ধে পাইনি। তারপরও বেশিরভাগ সালিশ তাকে জরিমানা করেছেন এবং গ্রামছাড়া করেছেন। জরিমানা করার কারণ, রতন রুবিনাকে বিয়ে করেছেন। আমি একা প্রতিবাদ করে কী করব! আমি এটাও বলেছি, গ্রামের বিচারে সর্বোচ্চ জরিমানা হয় তিন লাখ টাকা। বেশিরভাগ সালিসের উদ্দেশ্য কী ছিল, আমি জানি না।’

সালিশে থাকা রাজ্জাক বেপারী বলেন, ‘রতনকে আমরা জিজ্ঞেস করেছি, তুমি রুবিনাকে কীভাবে বিয়ে করলে? তুমি তো আগে একটি বিয়ে করেছ। তখন রতন বলে, আমাকে ঝালমুড়ি খাইয়ে কীভাবে কী করেছে, আমি জানি না। তখন আমরা মনে করেছি, তাহলে আর সাক্ষীর প্রয়োজন নেই। রুবেলের বিয়ে ভেঙে যাওয়া, জেল খাটা এবং পরে রুবিনাকে রতন বিয়ে করায় রুবেলকে কলঙ্কিত করা হয়েছে। তাই সালিসে জুরি ভোটে সাড়ে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পরে মাফ চাওয়ায় ৫০ হাজার টাকা কমানো হয়। এরপর রতনকে গ্রামছাড়া করা হয়েছে।’

রতন সরদারের প্রথম স্ত্রী হোসনে আরা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছে, এতে আমার সম্মতি ছিল। বিয়ে করায় আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমার স্বামীর কোনো অপরাধ নেই। তারপরও জাহাঙ্গীর শিকদার, রুবেল শিকদার, মোশারফ বেপারী, জামাল শেখ ও লতিফ খানরা মিলে তাকে জরিমানা করেছেন এবং ঘরছাড়া করেছেন। যারা আমার স্বামীর সঙ্গে জুলুম করেছেন, তাঁদের বিচার দাবি করছি।’

অভিযোগের বিষয়ে রুবেল শিকদার বলেন, ‘আমার স্ত্রীর সঙ্গে পরকীয়া করে রতন আমার সংসার তছনছ করে দিয়েছে। আবার আমার স্ত্রীকে বিয়ে করেছে। পরকীয়া না করলে বউ থাকতে, আবার বিয়ে করল কেন? আমি আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। তাই বৈঠকে সালিশরা রতনকে জরিমানা ও গ্রামছাড়া করেছেন।’

তবে রতন সরদার বলেন, ‘রুবিনা ও রুবেল শিকদারের ডিভোর্স হয়েছে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে। আর আমি তাকে বিয়ে করেছি গত মাসে। তাহলে আমি কী অপরাধ করেছি? আমি এলাকায় সঠিকভাবে চলি। এ কারণে রুবেলের পরিবার ও স্থানীয় সালিসরা আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে জুলুম করেছেন। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই।’

জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালেহ আহাম্মদ বলেন, ‘রতন সরদার এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এসআই হেমায়েতকে তদন্তের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’