টাঙ্গাইলের গোপালপুর একটি স্কুলের সহকারী শিক্ষককে ৩০ কর্ম দিবসের মধ্যে বিয়ে করার জন্য নির্দেশনামূলক নোটিশ জারি করেছেন ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক। এ ঘটনায় ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে উপজেলা শিক্ষা বিভাগ। দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
আজ বুধবার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাজনীন সুলতানা।
টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ধোপাকান্দি ইউনিয়নের সাজানপুর উচ্চ বিদ্যালয়ে এই ঘটনা ঘটেছে। স্কুলের ওই সহকারী শিক্ষকের নাম রনি প্রতাপ পাল। অন্যদিকে প্রধান শিক্ষকের নাম মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ নজরুল ইসলামের আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়মের তথ্য উদঘাটন করেছিলেন রনি প্রতাপ পালসহ কয়েকজন শিক্ষক। তাই মানসিক চাপে রাখতে এবং সামাজিকভাবে হেয় করতেই রনি প্রতাপকে এক মাসের মধ্যে বিয়ে করার নোটিশ দিয়েছেন প্রধান শিক্ষক।
এ ঘটনায় ওই এলাকার মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার প্রতিবাদে আজ বুধবার বিকেলে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করবেন বিদ্যালয়ের অন্যান্য শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্থানীয়রা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর এনটিআরসির বাছাই তালিকার মেধাক্রমে ওই বিদ্যালয়ে হিন্দু ধর্ম বিষয়ে সহকারী শিক্ষক পদে যোগদান করেন গোপালপুর উত্তরপাড়ার বাসিন্দা রনি প্রতাপ পাল। যোগদানের পরই তিনি এমপিওভুক্ত হন। গত ২৬ জুলাই ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম এক জরুরী নোটিশ করেন শিক্ষক রনি প্রতাপকে নিয়ে।
লিখিত নোটিশে বলা হয়, ‘আপনি গত ৬/১১/২০১৬ তারিখ অত্র বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (হিদু ধর্ম) পদে যোগদান করেন। যোগদানের পর অবগত হলাম আপনি অবিবাহিত রয়েছেন। পরবর্তী সময়ে আপনাকে বার বার মৌখিকভাবে তাগিদ দিয়েছি বিবাহ করার জন্য। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয়, যোগদানের কয়েক বছর অতিবাহিত হওয়ার পরেও আপনি বিবাহ করেননি। বিদ্যালয়টিতে সহশিক্ষা চালু রয়েছে। অভিভাবকগণ অবিবাহিত শিক্ষক নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন। সুতরাং বিদ্যালয়ের বৃহত্তর স্বার্থে নোটিশ প্রাপ্তির ৩০ (ত্রিশ) কর্ম দিবসের মধ্যে বিবাহের কার্য সম্পন্ন করে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার জন্য আপনাকে বিশেষভাবে নির্দেশ প্রদান করা হলো।’
এদিকে নোটিশ পাওয়ার দুদিন পর শিক্ষক রনি প্রতাপ প্রধান শিক্ষককে লিখিত জবাব দেন। লিখিত জবাবে তিনি লেখেন, ‘আমার অভিভাবকেরা আমার বিয়ের চেষ্টা করছেন। কিন্তু বাংলাদেশের হিন্দুদের বিয়ের পাত্র-পাত্রী বাছাইয়ে গাত্র বা বর্ণের বিষয় রয়েছে। তাছাড়া হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা শ্রাবণ থেকে কার্ত্তিক পর্যন্ত বিয়ে করাটা শুভ মনে করেন না। সুতরাং পারিবারিক ও ধর্মীয় রীতির কারণে আগামী অগ্রহায়ণ মাসে আমার অভিভাবকেরা আমাকে বিবাহ করাবেন বলে জানিয়েছেন।’
রনি প্রতাপ অভিযোগ করেন, এমন জবাব প্রধান শিক্ষক নজরুল ইলামের পছন্দ হয়নি। তিনি স্কুলের সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ডেকে নিয়ে সবার সামনে সাফ বলে দিয়েছেন নির্দিষ্ট কর্ম দিবসের মধ্যে বিয়ে না করলে তাঁকে চাকরিচ্যূত করা হবে।
এদিকে হয়রানির ভয়ে শিক্ষক রনি প্রতাপ গত ৩০ জুলাই উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার নাজনীন সুলতানার নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগে বলা হয়, ‘আমি অবিবাহিত থাকলেও কোনো অভিভাবক বা শিক্ষার্থী কখনো কারো নিকট আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করেনি। কিন্তু বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলামের স্বাক্ষর জাল করে চেকের মাধ্যমে স্কুলের বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার চলমান সরকারি তদন্তে যাতে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে সাক্ষী না দেই সেই জন্য আমাকে বিয়ের নামে চাপাচাপি ও হয়রানি করা হচ্ছে।’
স্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোশারফ হোসেন বলেন, ‘রনি প্রতাপ ভালো শিক্ষক। তাকে নিয়ে কেউ কখনো কোনো প্রশ্ন তোলেনি। অথচ দুটি সরকারি তদন্তে মিথ্যা সাক্ষী দিতে না চাওয়ায় প্রধান শিক্ষক তাঁকে এমন লজ্জাজনক নোটিশ দিয়ে হয়রানি করছেন।’
গিয়াস উদ্দিন নামের সাজানপুর এলাকার ব্যবসায়ী বলেন, যে শিক্ষককে বিয়ে করার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছে তিনি খুব ভালো মানুষ। কেউ কখনো তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেননি।
গৌতম চন্দ্র দাস নামে একজন অভিভাবক বলেন, ‘আমার মেয়ে ওই স্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়ে। প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম নিজের ইচ্ছেমতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করেন। অন্য শিক্ষকদের গুরুত্ব দেন না।’
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘রনি প্রতাপের স্বভাব চরিত্র নিয়ে স্কুল সংশ্লিষ্ট কেউ কোনো অভিযোগ করেনি। তবে সহশিক্ষা চলমান রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানে কোনো অবিবাহিত শিক্ষক থাকলে নানা অসুবিধা হতেই পারে। নানা অনৈতিক কিছু ঘটতেও পারে। এ জন্য তাকে দ্রুত বিয়ে করার নোটিশ দেওয়া হয়েছে।’
এদিকে স্কুলের বর্তমান সভাপতি থাকা সত্ত্বেও সাবেক সভাপতির স্বাক্ষর করা দুটি চেকের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে টাকা উত্তেলন করেন ওই প্রধান নজরুল ইসলাম। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটি নিয়মসিদ্ধ হয়নি। তবে চলমান সরকারি তদন্তের সঙ্গে রনি প্রতাপের নোটিশের কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানান তিনি।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার নাজনীন সুলতানা বলেন, ‘ঘটনাটি খুবই লজ্জাজনক। এভাবে নোটিশ করার এখতিয়ার কোনো প্রধান শিক্ষকের নেই।’
নাজনীন সুলতানা আরও বলেন, গতকাল মঙ্গলবার আমি বিদ্যালয়টিতে সরেজমিনের গিয়েছিলেন। এই নোটিশ দেওয়ার ব্যাপারে প্রধান শিক্ষক কোনো উত্তর দিতে পারেননি। প্রতিষ্ঠানটিতে কয়েক বছরের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এটি তদন্তের জন্য ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।