বাগেরহাটে ঘরে ঢুকে স্কুলশিক্ষককে কুপিয়ে হত্যা

বাগেরহাটে ঘরে ঢুকে এক প্রাক্তন স্কুলশিক্ষককে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এ সময় গুরুতর আহত হয়েছে ওই শিক্ষকের স্ত্রী ও মেয়ে। গতকাল সোমবার দিনগত রাতে বাগেরহাট সদর উপজেলার রাখালগাছি ইউনিয়নের ছোট পাইকপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

নিহত মৃনাল কান্তি চ্যাটার্জি (৬৫) ছোট পাইকপাড়া গ্রামের প্রয়াত কেশব লাল চ্যাটার্জির ছেলে। তিনি পাশের মধুদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন সহকারী শিক্ষক ছিলেন। এ সময় আহত তার স্ত্রী শেফালি চ্যাটার্জি (৬০) ও মেয়ে ঝুমা রানী চ্যাটার্জিকে (৩৫) বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর থেকে জেলার বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। হামলা হয়েছে বেশকিছু নেতা-কর্মী ও তাদের বাড়িঘরে। এতে অন্তত ৫৫ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে তাদের সবার পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। 

আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বহু মাছের ঘের দখল, মাছ ধরে নিয়ে যাওয়াসহ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হয়েছে। সোমবার দুপুরের পর থেকে বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মহড়ার কারণে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা একেবারেই না থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

২৫০ শয্যাবিশিষ্ট বাগেরহাট জেলা হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সোমবার দুপুর থেকে মঙ্গলবার দুপুর পর্যন্ত মারধরে আহত হয়ে সেখানে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩১ জন। তাদের বেশিরভাগই আওয়ামী লীগের কর্মী। তবে কয়েকজন বিএনপির কর্মী বলেও দাবি করেন।

তবে জেলার কোথাও কোনো সরকারি স্থাপনা, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলার খবর পাওয়া যায়নি। জেলায় হামলা ও বিশৃঙ্খলা রোধে বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় নেতা এবং ও ছাত্রদের সাথে মঙ্গলবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত একাধিক সভা করেছে জেলা পুলিশ।

হামলায় আহত হয়ে বাগেরহাট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শেফালি চ্যাটার্জি হাসপাতালের বেডে শুয়ে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনকে বলেন, ‘ঘর দরজা সব ভাঙছে, সব কিছু নিয়ে গেছে। কিচ্ছুই নেই। সন্ধ্যার দিকে একদল এসে বাড়ি ঢিল মারছে। তখনও বুঝিনি, রাত্রিরি আইসে এই ভাবে মাইরা ফ্যালবো।’

আর্তনাদ করতে করতে তিনি বলেন, ‘একটু জায়গা আছে, ওই জায়গা-জমিই কাল হইছে। একটু সম্পদের জন্নি তো, তোরা সব নিয়ে যাতি, মাইরে ফেললি কেন? সব ভাঙে ফেললি।’

মাথাসহ তার শরীরের বিভিন্ন ক্ষতস্থাতে ৩০ এর অধিক শেলাই দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে পাশের সিটে থাকা তার আহত মেয়ে ঝুমা রানী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‌‌'ঘরে আমার ছোট ছেলে ও বোন ছিল। তাদের ঘরের পাটাতন ওপর ও খাটের নিচে লুকিয়ে রেখে বাঁচাইছি। আমাগো কি দোষ। আমরা তো কোনো দল করি না। শুধু শুধু আমাগো ওপর কেন হামলা করল। আমার বৃদ্ধ বাবাকে হাতুড়ি দিয়ে পিটায় মেরে ফেলল।'

ঝুমা রানী চ্যাটার্জি আরও বলেন, 'প্রতিবেশী হুমায়ুন শেখ ও  নুরুল ইসলামের সাথে দীর্ঘদিন ধরে জমি সংক্রান্ত বিবাদ ছিল। গতকাল সন্ধ্যায় নুরুল ইসলাম বাড়িতে লোকজন নিয়ে এসে হুমকি দিয়ে যায়। রাতে মুখোশ পরে এসে আমাদের ওপর হামলা ও ভাংচুর লুটপাট করে। ঘরের সবকিছু নিয়ে যায় হামলাকারীরা।'

স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ঘটনার পর থেকে হুমায়ুন শেখ ও নুরুল ইসলাম শেখ পলাতক রয়েছেন। তাদেরকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

অন্যদিকে, কচুয়া উপজেলার বাধাল এলাকায় নাজমা সিকদার সেতারা (৫৩) নামের এক নারীকে কুপিয়েছে প্রতিপক্ষরা। তার বাড়ি থেকে হাস-মুরগি গবাদিপশুসহ সবকিছু নিয়ে গেছে। নাজমা সিকদার কচুয়ার গোপালপুর ইউনিয়ন মহিলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ছিলেন। তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের রক্ত জমাট বেঁধে গেছে। দুই পায়ে ক্ষত যখম হয়েছে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নাজমা সিকদার সেতারা বলেন, 'বাড়ির সব কিছু লুট হয়েছে গেছে। বাড়িতে কিচ্ছু নেই। হাস-মুরগি, ছাগল যা ছিল সব নিয়ে গেছে।' 

তবে চলমান পরিস্থিতি পুলিশ তাদের স্থাপনা ছেড়ে কোথাও যাতায়াত করছে না। গেল রাত থেকে কিছু এলাকায় সেনা টহল দেখা গেলেও একটা থমথমে পরিস্থিতি দেখা গেছে। বিএনপি-জামায়াতসহ আওয়ামী বিরোধী দলগুলোর নেতা-কর্মীদের মহড়া দেখা গেছে। এর অনেক মহড়ায় দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ঘুরতে দেখা গেছে অনেককে। মঙ্গলবার দুপুরে বাগেরহাট শহরের নাগেরবাজার এলাকায় প্রতিরোধ করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দুই পক্ষের মাঝে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনাও ঘটে।

সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, অবস্থার বাস্তবতায় পুলিশের মনবলের সংকট আছে। পরিস্থিতি উত্তরণে সবাই মিলে এগিয়ে যেতে চেষ্টা চলছে।