দরিদ্রতাকে হার মানিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে বাবা-মা হারা অরিত্র সরকার

এবারের মাধ্যমিক পরীক্ষায় অদম্য মেধাবী অরিত্র সরকার জিপিএ-৫ পেয়েছে। বাবা-মা হারানো অরিত্রর প্রবল ইচ্ছাশক্তির কাছে হার মেনেছে সবাই। দরিদ্রতাকে হার মানিয়ে সফলতা এনে দিয়েছে অরিত্রকে। তাই পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া বাবা-মার স্বপ্নপূরণ করতে ভবিষ্যতে প্রকৌশলী হতে চায় সে। প্রতিবেশি ও স্বজনরা অরিত্রের সাফল্যে দারুণ খুশি। অরিত্রের স্বপ্নপুরণে সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান প্রতিবেশি, শিক্ষক ও স্বজনদের।

জানা গেছে, বাগেরহাট শহরের আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে চলতি বছরে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে অরিত্র সরকার জিপিএ-৫ পেয়েছে। বাগেরহাট শহরের শালতলা এলাকার টিনশেডের ঘরে অরিত্র সরকারের বসবাস। দুই ভাই তারা। অরিত্র ছোট। বাড়ির সামনে অরিত্রের বাবা উৎপল সরকার টোলটুর একটি পানের দোকান ছিল। ওই দোকানের আয় দিয়ে ভালোভাবেই চলছিল তাদের ছোট্ট সংসার। হঠাৎ উৎপল সরকারের মৃত্যুতে সব এলোমেলো হয়ে যায়। এর দুই বছর পর মা নমিতা সরকারও মারা যান। চার বছরের মধ্যে বাবা-মাকে হারিয়ে অরিত্ররা দুই ভাই পিতৃমাতৃ হারা হয়ে পড়ে। অভাব অনটনের মধ্যে লেখাপড়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কিন্তু তারা দুই ভাই হাল ছাড়েনি। আত্নীয়-স্বজন ও নিজেদের উপার্জনে পড়ালেখা চলেছে তাদের। 
 
জানতে চাইলে অরিত্র সরকার বলে, ‘চারজনের একটি পরিবার ছিল আমাদের। প্রথম ধাক্কাটা আসে ২০২২ সালে। বাবা হঠাৎ করে মারা যান। এর দুই বছর পর ২৪ সালে বড় ভাইয়ের এসএসসি পরীক্ষা চলা অবস্থায় মাও আমাদের ছেড়ে চলে যান। শত সমস্যার মধ্যেও পড়ালেখা ছাড়িনি। চালিয়ে গেছি পড়া লেখা। বাবার রেখে যাওয়া দোকানটি চালু করি। কিন্তু অর্থ সংকটে সেই দোকানটিও বন্ধ করে দেই। লেখাপড়া চালাতে প্রাইভেট পড়ানো শুরু করি। এসএসসি পরীক্ষা সামনে আসতেই পড়ানো বাদ দিয়ে পড়ালেখায় মনেযোগি হই। পরীক্ষাটা দেই। মোবাইলফোনের মেসেজে প্রথমে আমার রেজাল্ট পাই।’

অরিত্র বলে, ‘দিনে ৮/১০ ঘণ্টা পড়ালেখা করে এই সফলতা পেয়েছি। শহরের আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয় দিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছি। লেখাপড়ায় সহযোগিতা পেয়েছি পরিবারের সদস্য ও আত্নীয়দের কাছ থেকে। শিক্ষকেরাও সহযোগিতা করেছেন। মা-বাবার স্বপ্ন ছিল আমাকে ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে। এই পড়ালেখা চালিয়ে নিতে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে হবে। এখনো আত্নীয় স্বজনেরা সহযোগিতা করছে, ভবিষ্যতে কতদিন করতে পারবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে। তাই সরকার ও সমাজের বিত্তবানরা এগিয়ে আসলে আমার স্বপ্নটা পূরণ করতে পারব।’

অরিত্রের বড় ভাই অর্ণব সরকার বলেন, ‘ভাইয়ের এই সাফল্যে অনেক খুশি হলেও শোকে আটকে যাই। আমার এসএসসি পরীক্ষা চলা অবস্থায় মা মারা যান। মায়ের মৃত্যর মধ্যে পরীক্ষা চালিয়ে যাই। এ বছর আমি উচ্চ মাধ্যমিক দিয়েছি। আমার বাবা-মার স্বপ্ন ছিল ছোট ভাই প্রকৌশলী হবে। তাই পড়ালেখা চালিয়ে নিতে সরকারও সমাজের বিত্তবানদের সহযোগিতা চাই। সবাই সহযোগিতা করলে আমার বাবা-মার স্বপ্ন পূরণ হতে পারে।’

প্রতিবেশি গোপাল সাহা বলেন, ‘বাবা-মা হারা অরিত্র সরকার অভূতপূর্ব ফলাফল করেছে। এতে আমরা দারুণ খুশি। জীবন সংগ্রামে অদম্য। দোকান চালিয়ে প্রাইভেট পড়িয়ে লেখাপড়া বন্ধ করেনি। বাবা-মার স্নেহ বঞ্চিত হয়েছে। অরিত্রর মতো এই মেধাবীদের পড়ালেখা যাতে বন্ধ না হয়, সে যেন পড়ালেখা চালিয়ে যেতে পারে সেজন্য সরকার সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানাচ্ছি।’

বাগেরহাট আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক কাজী মোতাছিমুল হক বলেন, ‘অরিত্র সরকার বাবা-মা হারিয়েও লেখাপড়া ছাড়েনি। তার ইচ্ছাশক্তির কাছে সবাই হার মেনেছে। সে ভালো ফলাফল করেছে। সে যাতে ভবিষ্যতে ভালো করতে পারে এবং তার লেখাপড়া যেন বন্ধ না হয় সেজন্য সমাজের বিত্তবানদের অরিত্রর পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছি।’