খুলনায় নারী ফুটবলারদের মারধর

মামলা তুলে নেওয়ার হুমকি, নিরাপত্তাহীনতায় খেলোয়াড়েরা

খুলনার বটিয়াঘাটায় চার নারী ফুটবলারকে মারধরের ঘটনায় করা মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আসামিরা হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। মামলার বাদী খুলনা জেলা অনূর্ধ্ব-১৭ দলের খেলোয়াড় সাদিয়া আক্তার তিন্নির অভিযোগ, মামলা তুলে না নিলে আসামিরা তাকেসহ অন্য খেলোয়াড়দের এসিড নিক্ষেপসহ নানা ধরনের হুমকি দিচ্ছেন। এ বিষয়ে তিন্নি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন।

তিন্নি বলেন, আসামিরা নানাভাবে তাকেসহ অন্য খেলোয়াড়দের এসিড নিক্ষেপের হুমকি দিচ্ছেন। আর এটা না পারলে আসামিরা নিজেদের জখম করে, বাড়িঘর ভাঙচুর করে সকল খেলোয়াড়, কোচসহ একাডেমির সবার নামে মামলা দেবে।

খুলনার বটিয়াঘাটার ১ নম্বর জলমা ইউনিয়নের তেঁতুলতলা গ্রামের তেঁতুলতলা প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে নারী ফুটবল একাডেমির খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণের ছবি তোলা ও কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করেন ওই এলাকার নূপুর খাতুন। এর প্রতিবাদ করায় তাদের হামলার শিকার হয় খুলনা জেলা অনূর্ধ্ব-১৭ দলের খেলোয়াড় ও তেঁতুলতলা সুপার কুইন ফুটবল একাডেমির খেলোয়াড় সাদিয়া আক্তার তিন্নি। সাদিয়া আক্তার তিন্নির ওপর হামলার প্রতিবাদ করতে গিয়ে আরও হামলার শিকার হয় খেলোয়াড় মঙ্গলী বাগচী, জুঁই মন্ডল, জারা হাজরা।

আসামিদের হামলার শিকার মঙ্গলী বাগচী এখন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মাথায় সেলাই নিয়ে চিকিৎসাধীন। অন্য খেলোয়াড়রা ভুগছেন অনিরাপত্তায়।

মঙ্গলী বাগচী বলেন, ‘আমরা সাদিয়ার মায়ের কথায় নূপুরদের বাড়ি গিয়ে প্রতিবাদ করি। তখন ওরা আমাদের বেধড়ক মারে। আমি হিন্দু বলে আমার ধর্ম নিয়েও গালি দেয়। ওদের মারের চোটে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই। পরে জ্ঞান ফিরলে দেখি, আমাকে চেয়ারে দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। আমার পাশের চেয়ারে দড়ি দিয়ে বাঁধা জুঁই মন্ডল। ’ পরে তাদের একাডেমির লোক গিয়ে তাদের উদ্ধার করে বলে জানান মঙ্গলী বাগচী।

তার মা সুচিত্রা বাগচী বলেন, তারা বটিয়াঘাটার হুগুলবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা। তার মেয়ে বান্দা স্কুল অ্যান্ড কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের মানবিক বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্রী। সে ফুটবল খেলতে আগ্রহী বলে তেঁতুলতলা সুপার কুইন ফুটবল একাডেমিতে ভর্তি করেন। সেখানে সে আবাসিক হলে থেকে খেলা শেখে।

সুচিত্রা বলেন, ‘আমার মেয়েসহ অন্য মেয়েদের যারা মেরেছে, তাদের শাস্তি দাবি করছি। ’‌‌‌‌

একই রকম দাবি নারী খেলোয়াড় জুঁই মন্ডল, জারা হাজরা, ঋতু বৈরাগীর। তারা পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তার দাবি করেছেন।

তেঁতুলতলা সুপার কুইন ফুটবল একাডেমির প্রশিক্ষক মোস্তাক হোসেন ও সভাপতি দিলীপ বৈরাগীর দাবি, এই খেলোয়াড়রা জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে খেলাধুলা করে। শুধুমাত্র বটিয়াঘাটা উপজেলা নয়, পার্শ্ববর্তী দাকোপ, ফুলতলা উপজেলা থেকে নারী খেলোয়াড়রা এখানে এসে প্রশিক্ষণ নেয় ও বসবাস করে। তাদের জন্য রয়েছে আবাসন ব্যবস্থা। বটিয়াঘাটা উপজেলা চেয়ারম্যান আশরাফুল আলম খান এই ক্লাবের বড় উদ্যোক্তা। তিনিই ক্লাবের সকল খরচ বহন করেন। নারী ফুটবলের উৎকর্ষ সাধনে তাঁর এই উদ্যোগ।

কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনায় অনিরাপত্তায় ভুগছেন তাঁরা। অবিলম্বে আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

পুলিশ বলছে, মামলার এজাহারভুক্ত আসামি নূপুর খাতুনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত অপর আসামি আলাউদ্দিন, সালাউদ্দিন, নুর আলম, রঞ্জি বেগম ও মনোয়ারা বেগমকে গ্রেপ্তার করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। নারী ফুটবলারদের নিরাপত্তায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলেও জানায় পুলিশ।

বটিয়াঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শওকত কবির বলেন, ‘আমরা মূল আসামি নূপুর খাতুনকে গ্রেপ্তার করেছি। অন্য আসামিদের ধরতে অভিযান অব্যাহত আছে। ’

ওসি বলেন, ‘সাদিয়া হুমকি ও নিরাপত্তার কথা বলে থানায় জিডি করেছে। আমি বিকেলে ঘটনাস্থল এবং ওই এলাকা পরিদর্শন করেছি। নারী ফুটবলাররা নির্বিঘ্নে প্রশিক্ষণ নেবে। তাদের সম্পূর্ণ নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে পুলিশ। ’

গত ২৯ জুলাই রাতে নারী ফুটবলারদের ওপর হামলা করে আসামিরা। এই ঘটনায় নারী খেলোয়াড় সাদিয়া আক্তার তিন্নি নিজে বাদী হয়ে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা করে। এখন পর্যন্ত এজাহারভুক্ত ছয় আসামির মাত্র একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।