নেত্রকোণায় বন্যা পরিস্থিতি:  নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত, শিশুর মৃত্যু

বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোণায় কলমাকান্দার পর নতুন করে সদর ও বারহাট্রা, খালিয়াজুরী, মোহনগঞ্জ, দুর্গাপুরে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে। এতে করে জেলার অন্তত ১২০টি গ্রাম পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। মোহনগঞ্জে ঢলের পানিতে ডুবে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

বন্যা পরিস্থিতে আশ্রয় কেন্দ্রে ১৪০ জন আশ্রয় নিয়েছে। প্লাবিত এলাকার গ্রামীণ রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় চলাচলে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে পানিবন্দি মানুষেরা। স্থানীয় প্রশাসন থেকে ত্রাণ তৎপরতা শুরু হয়েছে। জেলার প্রধান নদীগুলোর পানি এখনও বাড়তির দিকে।

স্থানীয়রা জানায়, কলমাকান্দায় ৮টি ইউনিয়নে ৬৫টি গ্রাম, সদর উপজেলার কেগাতি ইউনিয়নের ১০টি গ্রাম, বারহাট্রায় আসমা, চিরাম, রায়পুর ও সিংধা ইউনিয়নের ২৫টি গ্রাম, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরীর ২০টি গ্রামে পানি ঢুকেছে।

মোহনগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘উপজেলার মাঘান সিয়াধার ইউনিয়নের গৌড়াকান্দা গ্রামের মিন্টু মিয়ার ৮ বছরের শিশু তোরা মণি বাড়ির সামনে ঢলের পানিতে ডুবে মারা গেছে।’

কলমাকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসাদুজ্জামান বলেন, ‘উপজেলার কলমাকান্দা উপজেলার ৮টি ইউনিয়নের ৬৫ গ্রাম পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে। বিশরপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয় কেন্দ্রে ৫টি পরিবারের ২০জন রয়েছেন। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের সঙ্গে সমন্বয় করে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। নগদ ১ লাখ টাকা ও ১০ টন জিআর চাউল থেকে বিতরণ করা হচ্ছে। আরও পর্যাপ্ত ত্রাণ রয়েছে।’

সদরের কেগাতি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেন বলেন, ‘ইউনিয়নের হরিদাসপুর, করুই কান্দি, বড়খাটুরি, কর্ণহলা, কুমারপুরসহ অন্তত ১০টি গ্রামের মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন। এলাকার বেশকিছু গ্রামীণ সড়ক বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে।’

বারহাট্রা উপজেলার সিমিয়া গ্রামের বাসিন্দা বজলুর রহমান বলেন, ‘গ্রামে পানি ঢুকে গেছে। রাস্তা ডুবে যাওয়ায় বাড়ি থেকে বের হতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। দোকানপাটে যেতে পারছি না। বিশেষ করে গরু-বাছুর নিয়া বেকায়দায় আছি। বাড়ির সামনে পতিত সব জাগা ডুবে যাওয়ায় গরুর খাদ্য মিলাইতে পারতাছি না।’

কলমাকান্দা উপজেলার হিরাকান্দা গ্রামের বাসিন্দা জালাল আকন্দ বলেন, ‘দেখতে দেখতে পরশুদিন পানি আইয়া বাড়ি-ঘর ঘিইর‍্যা ধরছে। বাড়িতে গোলায় থাকা সারা বছরের খাওয়ার ধান পানিতে ভিজে গেছে। এগুলো মনে হয় না আর কোনো কাজে আইবো। গরু-ছাগল লইয়া বেশি বিপদে পড়ছি। গরুরে কি খাওয়াইবাম। শিশুদের নিয়াও সমস্যায় পড়ছি। চারদিকে পানি আর পানি।’

সদরের কুমারপুর গ্রামের বাসিন্দা আয়েশা আক্তার। তিনি বলেন, ‘পানি আওনে রান্না-বান্না করতাম পারতাছি না। খুব কষ্টে আছি।’

সদরের বন্ধপাটলি গ্রামের নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ৭ কাটা পুকুরের সব মাছ ভাইস্যা গেছেগা। প্রায় ২ লাখ টাকা মাছ আছিল।’

নেত্রকোণা জেলা প্রশাসক শাহেদ পারভেজ বলেন, ‘জেলায় ২৮৯টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। নতুন করে খালিয়াজুরীতে আশ্রয় কেন্দ্রে ৩০টি পরিবারের ১২০জন আশ্রয় নিয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের কাছে ত্রাণ পাঠানো হয়েছে। জেলা প্রশাসনের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে ত্রাণ সামগ্রী রয়েছে।’

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে নদ–নদীর সর্বশেষ তথ্য জানিয়ে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সারওয়ার জাহান বলেন, ‘কলমাকান্দা পয়েন্টে উব্ধাখালি নদীর পানি বিপৎসীমার ৪৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। কংশ নদের পানি জারিয়া পয়েন্টে বিপৎসীমার কাছাকাছি ৭১ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে বইছে। সোমেম্বরীর পানি দুর্গাপুর পয়েন্টে বিপৎসীমার ১ দশমিক ৬১ মিটার এবং বিজয়পুর পয়েন্টে ২ দশমিক ৯৯ মিটার নীচ দিয়ে বইছে। এ ছাড়া জেলার হাওরাঞ্চলের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া ধনু নদের পানি খালিয়াজুরী পয়েন্টে বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ২২ সেন্টিমিটার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।’