২০ বছরেও হদিস মেলেনি ১২ জেএমবির

২০০৩ সালের ১৪ আগস্ট দিবাগত মধ্য রাতে জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার উত্তর মহেশপুর গ্রামে জেএমবি-পুলিশের মধ্যে সংঘটিত ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ও পরদিন ক্ষেতলাল থানায় মামলার পর থেকে দীর্ঘ ২০ বছরেও হদিস মিলছে না তালিকাভুক্ত ১২ জেএমবি সদস্যের। ফলে জনমনে আতঙ্ক থাকলেও নিরাপত্তার আশ্বাস দিচ্ছে পুলিশ।

মামলা সূত্রের বরাত দিয়ে ক্ষেতলাল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আনোয়ার হোসেন জানান, ২০০৩ সালের ১৪ আগস্ট  দিবাগত মধ্য রাতে ক্ষেতলাল উপজেলার উত্তর মহেশপুর গ্রামে আঞ্চলিক জেএমবি কমান্ডার মন্তেজার রহমানের বাড়িতে গোপন বৈঠকে বসে দেশের শীর্ষ জঙ্গি নেতাসহ জেএমবির নেতাকর্মীরা।

খবর পেয়ে জয়পুরহাট সদর ও ক্ষেতলাল থানার পুলিশ উত্তর মহেশপুর গ্রামে মন্তেজার রহমানের বাড়ি ঘেরাও করে  জেএমবি জঙ্গিদের আত্মসমর্পণের নির্দেশ দেয়। এ সময় তারা পুলিশের ওপর হামলা চালালে পুলিশও পাল্টা গুলি বর্ষণ করে। উভয়পক্ষের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে জয়পুরহাট সদর থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ইকবাল শফিসহ ৫ পুলিশ সদস্য গুরুতর আহত হন। এ ছাড়া জেএমবি জঙ্গিরা পুলিশের তিনটি শর্টগান, ৪৫ রাউন্ড গুলি,  একটি ম্যাগাজিন ও একটি ওয়াকিটকি লুট করে নিয়ে যায়। 

পরদিন ১৫ আগস্ট এ ঘটনায় সদর থানার তৎকালীন পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে ক্ষেতলাল থানায় ৩৩ জনকে জেএমবি সদস্য হিসেবে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। ঘটনার রাতেই জঙ্গি কর্মকাণ্ডের অভিযোগে র্পুলিশ ২০ জনকে গ্রেপ্তার করে। ঘটনার দুদিন পর ১৭ আগস্ট ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকা থেকে জেএমবি সদস্যদের কিছু বিস্ফোরক সামগ্রী, পুলিশের লুট হওয়া ওয়াকিটকি ও একটি শর্টগান উদ্ধার হলেও বাকি অস্ত্র পায়নি পুলিশ।

ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ২০০৮ ও ২০১০ সালে দায়ের করা আরও ৩টি মামলায় ৬১ জন আসামির বিরুদ্ধে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। বর্তমানে জয়পুরহাট জেলা কারাগারে রয়েছেন ৮ জন, জামিনে মুক্ত আছেন ৩৮ জন, মৃত্যুবরণ করেছেন ২ জন, আর জামিন নিয়ে এখনো পলাতক রয়েছেন ১২ জন ।

পলাতকরা হলেন- জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার উত্তর মহেশপুর গ্রামের আব্দুল কাদের, আক্কেলপুর উপজেলার ডারাপুর গ্রামের (পরিবর্তিত ঠিকানা: নওগাঁর রানীনগর উপজেলার মৃত লাল মোহাম্মদের পালক ছেলে) সাইফুল ইসলাম ওরফে খোকন ও সদর উপজেলার মিটনা গ্রামের হেলাল ওরফে মাহবুব, বগুড়ার গাবতলী উপজেলার নেপালতলী গ্রামের আরিফুর রহমান ওরফে আব্দুল্লাহ, নওগাঁ সদর উপজেলার কুসুম্বি গ্রামের আব্দুল কুদ্দুস, রাজশাহীর বাঘমারা উপজেলার ঝিকরা কয়রাবাড়ি গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম ও তানর উপজেলার চাঁদপুর গ্রামের শহিদুল্লাহ ফারুখ ওরফে সেলিম, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার সন্ন্যাসকুপ গ্রামের তুফান ওরফে আবুল কাসেম ও ভোলাহাট উপজেলার চামামুছরী গ্রামের ছারোয়ার হোসেন, ঠাকুরগাঁর হরিপুর উপজেলার বিরগড় গ্রামের তরিকুল ইসলাম ওরফে ভাগ্নে শহিদ ও হরিপুর উপজেলার বিরগড় গ্রামের আনোয়ার হোসেন এবং গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার বারোকোনা গ্রামের মামুনুর রশিদ।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী নৃপেন্দ্রনাথ মন্ডল জানান, ‘কারাগারে আটক জঙ্গিদের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন জেলায় একাধিক সংশ্লিষ্টতা বিষয়ে মামলা থাকায়  তাদের সেব জেলার আদালতে হাজিরা দিতে হয়। এতে বছরের পর বছর ধরে একদিকে আসামিদের  অনুপস্থিতি অন্যদিকে স্বাক্ষী জটিলতার কারণে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিলের ২০ বছর পরও বিচার কাজ শেষ করা সম্ভব হচ্ছে না। চলমান প্রক্রিয়ার ধারাবহিকতায় বিচারাধীন এ মামলাটি আগামী ১৬ নভেম্বর আবারও আদালতে উঠবে।’

তিনি আরও বলেন, এ ঘটনায় ফাঁসি কার্যকর হওয়া শীর্ষ জঙ্গি নেতা আতাউর রহমান সানি ও আব্দুল আউয়ালসহ ১৯ জঙ্গিকে সেসময় ক্ষেতলাল থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও পরে তারা উচ্চ আদালত থেকে জামিন নেন। আর আটক জঙ্গিদের সঙ্গে দেখা করতে এসে জয়পুরজাট কারাগাড়ের মূল ফটকে ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার হন ফাঁসি কার্যকর হওয়া আরেক জঙ্গি নেতা সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই। পরে তিনিও জামিনে ছাড়া পেয়েছিলেন।

১৪ জুলাই জয়পুরহাটে আদালত ভবন, পুলিশ লাইন্স, ডিবি অফিস, বিজিবির দপ্তর, র‍্যাব ক্যাম্প, দুটি সরকারি ব্যাংক উড়িয়ে দেওয়ার পাশাপাশি বিচারক, হিন্দু পুরোহিত-সেবায়েতসহ নানা শ্রেণি-পেশার বিশিষ্ট জনদের হত্যার হুমকি দিয়ে জেএমবির নামে চিঠি পাঠানো হয় জেলা ও দায়রা জজ আদালতে। এ ঘটনায় সে সময় জয়পুরহাট সদর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছিল। 
 
এর আগে, কালাই উপজেলার বেগুন গ্রামে ২০০৩ সালের ১৯ জানুয়ারি রাতে খানকায়ে চিশতিয়া তরিকাপন্থী  পীরের ৫ জন অনুসারী বা ঘনিষ্ট মুরিদকে গলা কেটে হত্যা করে দেশে প্রথমবারের মতো নিজেদের অবস্থানের কথা জানান দেয় জেএমবির জঙ্গিরা। তারপর একই বছরের ১৪ আগস্ট গভীর রাতে ক্ষেতলাল উপজেলার উত্তর মহেশপুর গ্রামে জেএমবি নেতা মন্তেজার রহমানের বাড়িতে গোপন বৈঠক চলাকালে পুলিশ বাড়িটি ঘেরাও করলে পুলিশের সাথে জেএমবি সদস্যদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

এ দিকে পলাতক জঙ্গিদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা না গেলে আইন-শৃঙ্খলার অবনতির আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান নাম প্রকাশে অনেচ্ছুক অনেক সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা ।

তবে পুনরায় জঙ্গি হামালার আশঙ্কা দেখছে না পুলিশ প্রশাসন। সর্বসাধারণকে আশ্বস্থ করে জয়পুরহাট পুলিশ সুপার নূরে আলম জানান, “কোন পরিস্থিতির জন্য অতিতের যে কোন সময়ের চেয়ে পুলিশ এখন যথেষ্ঠ শক্তিশালী, তথ্য-প্রযুক্তিতে সর্বাধুনিক, গোয়েন্দা তৎপরতায় চৌকস, আধুনিক অস্ত্র-শস্ত্রে সুসজ্জিত। তাই যে যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পুলিশ সক্ষম বলে জঙ্গি হোক আর যে কোনো নাশকতাই  হোক না কেন সকল অপতৎপরতা গুড়িয়ে দেওয়ার মত সক্ষমতা পুলিশের রয়েছে।”
 
পলাতক জঙ্গিরা দেশে থাকলে তাদের পুলিশের জালে ধরা পরতেই হবে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলেও জানান পুলিশ সুপার।