বকেয়া মজুরি পরিশোধের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি পালন করছেন রাষ্ট্র মালিকানাধীন ন্যাশনাল টি কোম্পানির ১৩ হাজার চা-শ্রমিক। ১১ সপ্তাহ ধরে বেতন ও রেশন বন্ধ থাকায় চরম অর্থকষ্টে দিন কাটছে তাদের। কর্তৃপক্ষ বলছে, ব্যাংক ঋণ জটিলতায় এই সংকট তৈরি হয়েছে।
মৌলভীবাজারে রাষ্ট্র মালিকানধীন ন্যাশনাল টি কোম্পানির প্রেমনগর চা বাগানের শ্রমিক রমনী ঘাটুয়া। তার ছেলেও এই বাগানের তালিকাভুক্ত শ্রমিক। প্রায় ৩ মাস ধরে মজুরি ও রেশন পাচ্ছেন না তারা। এতে চরম অর্থ সংকটে দিন কাটাচ্ছে ৭ সদস্যের পরিবারটি।
বাগানটিতে কর্মরত ৭০০ শ্রমিকসহ ন্যাশনাল টি কোম্পানির ১৩ হাজার শ্রমিকের একই অবস্থা। বেতন ও অন্যান্য সুবিধা বন্ধ থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা।
একজন চা শ্রমিক বলেন, ‘আমরা কষ্টের মধ্যে চলতে আছি। তলব পাইনা দশ সপ্তাহ হয়। কী কষ্টে যে আমরা কাজ করে চলি আমরা বুঝি। আমার একটা বাচ্চা হইছে আড়াই মাস, বাচ্চা হওয়ার পর থেকে তলব বন্ধ। আমরা কী করে চলবো বাচ্চা কী খাওয়াবো আর আমরা কী খাব? আমরা মনে করেন ১০ টাকার মুড়ি আনলে সকালে কোন মতে খাই বাচ্চাকাচ্চা নিয়া। এই যে চোখের জল আসতেছে। দেখতেছেন ভালো কিন্তু আমাদের অবস্থা ভালো নাই।’
চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারা জানিয়েছেন, কর্তৃপক্ষের আশ্বাসে শ্রমিকেরা ৬ সপ্তাহ মজুরি ছাড়াই উৎপাদন চালিয়ে গেছেন। বেতন না পেয়ে বাধ্য হয়ে ২০ অক্টোবর থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু করেন তারা।
চা শ্রমিক ইউনিয়নের সহ-সভাপতি পংকজ কন্দ বলেন, ‘এই শিল্পের সাথে লক্ষাধিক মানুষ জড়িত আছে। কারণ আমরা চাইনা এই শিল্পটা ধ্বংস হয়ে যাক। এই শিল্প টা ধ্বংস হলে এই যে চা শ্রমিকেরা যাদের কোন ভিটামাটির অধিকার পর্যন্ত নেই তারা যাবে কোথায়? তারা থাকবে কোথায়?’
এক মাসেরও বেশি সময় শ্রমিক আন্দোলনে চা উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় এ শিল্পের ব্যাপক লোকসানের আশংকা সংশ্লিষ্টদের।
মৌলভীবাজার এনটিসি প্রেমনগর চা বাগানের ব্যবস্থাপক হোসাইন উদ্দিন বলেন, ‘তারা কাজ বন্ধ করায় বাগানের ক্ষতি হলো, তারা যদি কাজটা চলমান রাখতো তাহলে আমরা এই সিচুয়েশনে দাড়াইতাম না।এখন পাতি চয়ন বা উৎপাদনের মুক্ষম সময়। যেহেতু অনেকদিন হয়ে গেছে চাপাতি সেকশনে জঙ্গল লেগে গেছে। পাতি উঠানোর মত অবস্থায় এখন আর নাই। আমরা যে কচি পাতি কালেকশন করি ওইটা আর সম্ভব না।’
কৃষি ব্যাংকের কাছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা ঋণগ্রস্ত ন্যাশনাল টি কোম্পানি। ঋণ জটিলতায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে সমস্যা হচ্ছে জানিয়ে শ্রম দপ্তরের কর্মকর্তা জানান, আলোচনা করে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা চলছে।
শ্রীমঙ্গল শ্রম দপ্তরের উপ-পরিচালক নাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘৪০০ কোটি টাকার কাছাকাছি কৃষি ব্যাংকের কাছে তাদের লাইবেলিটি। এখন কৃষি ব্যাংক নতুন করে ওনাদেরকে টাকা দিচ্ছেন না। এখন যদি স্পেশাল কোন সিদ্ধান্তের আলোকে সেটা হতো বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত লাগবে এবং একটা প্রসিডিউর লাগবে। সেটা উনারা অগ্রসর হচ্ছেন কিন্তু এখন পর্যন্ত সেরকম কোন রেজাল্ট ওনাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি।’
মৌলভীবাজারে ৭টিসহ সিলেট অঞ্চলে এনটিসির ১২টি চা বাগান রয়েছে। এসব বাগানে কর্মরত ১৩ হাজার শ্রমিকের ওপর নির্ভরশীল অর্ধলাখ মানুষ।