২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে স্বাগত জানালেও ব্যবসা ও বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ফিকি)। বৃহস্পতিবার প্রস্তাবিত অর্থবিল ২০২৬ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পর্যালোচনা করে এ উদ্বেগ জানায় সংগঠনটি।
প্রেস নোটে জানানো হয়, ফিকি প্রস্তাবিত অর্থবিল ২০২৬ এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পর্যালোচনা করেছে এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন ও বিনিয়োগ-বান্ধব অর্থনীতি গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারের কৌশলগত থ্রি আর (রিকভারি, রিস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন) ফ্রেমওয়ার্ককে স্বাগত জানিয়েছে।
এতে বলা হয়, কর, ভ্যাট এবং কাস্টমস ব্যবস্থায় অধিকতর স্পষ্টতা, সরলীকরণ, পূর্বাভাসযোগ্যতা ও ডিজিটালাইজেশনের মাধ্যমে বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়নে সরকারের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন হিসেবে ফাইন্যান্স বিল ২০২৬-কে একটি ইতিবাচক, প্রগতিশীল এবং ব্যবসা-বান্ধব উদ্যোগ হিসেবে দেখছে ফিকি। নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ এবং প্রযুক্তি-ভিত্তিক সংস্কারের উপর এই গুরুত্ব আরোপ বিনিয়োগকারীদের আস্থা সুদৃঢ় করবে এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ইতিবাচক অবদান রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ইতিবাচক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে রাজস্ব ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, করদাতাদের হয়রানি হ্রাস এবং কর্পোরেট তারল্য সুরক্ষায় বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। উৎস কর কর্তনকে (টিডিএস) ন্যূনতম করের পরিবর্তে অগ্রিম কর হিসেবে গণ্য করার সিদ্ধান্তটি আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কার্যকরী মূলধনের সংকট উল্লেখযোগ্যভাবে লাঘব করবে, পাশাপাশি প্রস্তাবিত স্বয়ংক্রিয় ও ফেসলেস রিফান্ড ব্যবস্থা স্থিতিশীল ব্যবসায়িক নগদ প্রবাহ বজায় রাখতে সহায়তা করবে। তদুপরি, উৎসে কর কর্তন না করার কারণে বৈধ ব্যবসায়িক খরচ অনুমোদন না করার বিধান বাতিল করা, পারকুইজিট ও প্রচারণামূলক ব্যয়ের সীমা বৃদ্ধি, বকেয়া বা অ্যাক্রুয়াল ভিত্তিতে সুদের খরচ অনুমোদনের উদ্যোগ এবং আপিল পর্যায়ে বিতর্কিত প্রদেয় করের পরিমাণ হ্রাস করা করদাতাদের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন।
ভ্যাট ব্যবস্থার অধীনে, মাসিক জমার পরিবর্তে ত্রৈমাসিক ভ্যাট রিটার্ন দাখিলের সুযোগ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কমপ্লায়েন্স বা নিয়মপালনের বোঝা এবং প্রশাসনিক খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেবে। শিল্পায়নকে আরও উৎসাহিত করতে কাঁচামাল আমদানি, বৈদেশিক ঋণের সুদ এবং যন্ত্রপাতি ভাড়ার ওপর উৎসে করের হার হ্রাস করার প্রস্তাব উৎপাদন ও অর্থায়নের খরচ কমিয়ে আনবে, পাশাপাশি " BanglaBiz " প্ল্যাটফর্মের যাত্রা শুরু এবং মূলধন ও মুনাফা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজীকরণ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জোরালোভাবে সহায়তা করবে।
এসব ইতিবাচক পদক্ষেপের পাশাপাশি ফাইন্যান্স বিলে বেশ কিছু উদ্বেগের ক্ষেত্র রয়েছে যা আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও কর্পোরেট করের হার অপরিবর্তিত রয়েছে, তবে দীর্ঘমেয়াদী কর হ্রাসের রোডম্যাপ না থাকায় আঞ্চলিক প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বল হতে পারে। এছাড়া, কোনো অন্তর্বর্তীকালীন সময় বা মাঠ পর্যায়ে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়াই বৃহৎ ও বহুজাতিক করদাতাদের জন্য ই-ভ্যাট সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করা মারাত্মক ব্যবহারিক জটিলতা তৈরি করতে পারে। ব্যক্তিগত আয়করের সর্বোচ্চ হার বাড়িয়ে ৩৫ শতাংশ করার ফলে দক্ষ বিদেশি পেশাদারদের নিয়োগের খরচ বৃদ্ধি পাবে, অন্যদিকে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির এই সময়ে খরচ কর্তনের শর্তাবলীর সুনির্দিষ্ট স্পষ্টীকরণের অভাবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কমপ্লায়েন্স খরচ বেড়ে যেতে পারে।
খুচরা পর্যায়ে প্রস্তাবিত ০.২ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) আদায়ের বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত কঠিন এবং এটি পরিচালনাগত বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে বিধায় ফিকি এটি প্রত্যাহারের জোর সুপারিশ জানিয়েছে, পাশাপাশি ক্যাশলেস লেনদেনের প্রণোদনা প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার এবং অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় উৎসাহিত করতে ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের বিনিয়োগ রেয়াত সুবিধা পুনর্বহাল করার অনুরোধ জানিয়েছে। চেম্বার জোর দিয়ে বলছে যে সমস্ত আর্থিক পদক্ষেপ অবশ্যই ভবিষ্যৎমুখী বা প্রস্পেক্টিভলি বাস্তবায়ন করা উচিত, কারণ অতীতমুখী বা রেট্রোস্পেক্টিভ প্রয়োগ বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করে এবং দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগকে নিরুৎসাহিত করে।
আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৯৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৩.৭ শতাংশ এবং পূর্ববর্তী অর্থবছরের তুলনায় একটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে। মানব উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট প্রধান খাতগুলোতে বড় বরাদ্দ প্রস্তাব করা হয়েছে, যার মধ্যে শিক্ষার জন্য ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য খাতের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তবে মোট রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী মনে হচ্ছে এবং এর জন্য করের আওতা কার্যকরভাবে সম্প্রসারণের প্রয়োজন হবে। ২৪৩ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে দেশীয় ও বৈদেশিক উভয় উৎস থেকেই তহবিলের প্রয়োজন হবে। ফিকি লক্ষ্য করেছে যে ব্যয় এবং রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রার মধ্যকার এই বিশাল ব্যবধান রাজস্ব আহরণ জোরদার করা, দক্ষ সরকারি ব্যয় নিশ্চিত করা এবং কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার পরম গুরুত্বকে তুলে ধরে। চূড়ান্ত বিচারে, ফাইন্যান্স বিল ২০২৬-এর সফলতা নির্ভর করবে এর কার্যকর বাস্তবায়ন, নীতিমালার নিশ্চয়তা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা জোরদারকরণ এবং ব্যবসা সহজীকরণ প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক উন্নয়নের ওপর।
প্রস্তাবিত ৬.৯৫ লাখ কোটি টাকার মোট রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূর্ববর্তী অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২৩ শতাংশ থেকে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত একটি অবাস্তব রাজস্ব প্রবৃদ্ধির দাবি রাখে। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এই লক্ষ্যমাত্রাটি অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী মনে হয়, যা বাস্তবায়ন করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই আর্থিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা মূলত করের আওতা সফলভাবে সম্প্রসারণ করা এবং আনুষ্ঠানিক রাজস্ব ব্যবস্থার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন করদাতাকে নিয়ে আসার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করবে।