একটা যুদ্ধ চলছে ইরানে, কিন্তু তার চাপ এখন গিয়ে পড়ছে আমেরিকার নিজের তেলভাণ্ডারে। যে দেশ বিশ্বের সবচেয়ে বড় সামরিক শক্তি, সেই আমেরিকার জরুরি তেলের মজুত নেমে গেছে ৪৩ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
মাত্র কয়েক মাসের যুদ্ধেই বের করে নেওয়া হয়েছে ১১ কোটি ব্যারেলেরও বেশি তেল। আরও ভয়ংকর বিষয় হলো—এই মজুত থেকে বাকি তেলও বাজারে ছাড়তে হলে আমেরিকার তেলভাণ্ডার চলে যাবে এমন এক পর্যায়ে, যা আগে কখনোই দেখা যায়নি। অর্থাৎ, ইরানের যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহে চাপ তৈরি করেনি—আমেরিকার নিজের জ্বালানি নিরাপত্তার মজুতেও ফেলেছে বড় ধাক্কা।
যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) হলো দেশটির জরুরি পরিস্থিতির জন্য রাখা বিশাল তেলের ভাণ্ডার। যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা বৈশ্বিক তেল সরবরাহে বড় সংকট দেখা দিলে এই মজুত থেকে তেল বাজারে ছেড়ে দাম ও সরবরাহের চাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করে ওয়াশিংটন।
কিন্তু ইরান যুদ্ধের পর এবার সেই ভাণ্ডার থেকেই বিপুল পরিমাণ তেল বের করতে হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে অভিযান শুরু করার পর হরমুজ প্রণালিতে তেল চলাচলে বড় ধরনের বিঘ্ন তৈরি হয়। বিশ্ববাজারে তৈরি হয় বড় সরবরাহ ঘাটতি। এরপর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ কমাতে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সমন্বিত কৌশলগত তেল ছাড়ের উদ্যোগ নেয় ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সি (আইইএ)। এর অংশ হিসেবে মার্চে যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করে—স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ থেকে প্রায় ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়া হবে। আর এর ফল এখন স্পষ্ট।
ইআইএর তথ্য অনুযায়ী, মার্চের মাঝামাঝি আমেরিকার কৌশলগত তেলের মজুত ছিল প্রায় ৪১ কোটি ৫৪ লাখ ব্যারেল। কিন্তু জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে সেটি নেমে এসেছে মাত্র ৩০ কোটি ৪৮ লাখ ব্যারেলে। অর্থাৎ কয়েক মাসেই কমেছে প্রায় ১১ কোটি ৬ লাখ ব্যারেল। এটাই এখন বড় সতর্কসংকেত।
কারণ এই মজুত সর্বশেষ এত নিচে নেমেছিল ১৯৮৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। অর্থাৎ চার দশকেরও বেশি সময় পর আবার সেই পর্যায়ে পৌঁছেছে আমেরিকার জরুরি তেলের ভাণ্ডার।
আর এখানেই শেষ নয়। যুক্তরাষ্ট্র যে ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিল, তার পুরোটা এখনো বাজারে যায়নি। বাকি অংশও যদি ছাড়তে হয়, তাহলে স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ নেমে যেতে পারে প্রায় ২৪ কোটি ৩০ লাখ ব্যারেলে। তাহলে সেটি হবে ১৯৮২ সালে সাপ্তাহিক তথ্য প্রকাশ শুরু হওয়ার পর সর্বনিম্ন মজুত।
ইরান যুদ্ধের শুরুতে প্রশ্ন ছিল—কত দ্রুত তেহরানকে চাপের মধ্যে ফেলা যাবে। কয়েক মাস পর সেই হিসাবের আরেকটি দিক সামনে এসেছে—আমেরিকা চাপ দিচ্ছে, কিন্তু সেই চাপ সামলাতে নিজের জরুরি তেলের ভাণ্ডারও খুলে দিতে হচ্ছে। আর যদি হরমুজ প্রণালির সংকট দীর্ঘ হয় এবং আরও তেল ছাড়তে হয়, তাহলে ৪৩ বছরের রেকর্ড তলানি ভেঙে আমেরিকার ইতিহাসের সর্বনিম্ন কৌশলগত তেল মজুতের নতুন রেকর্ড তৈরি হতে পারে। যুদ্ধের আসল খেসারত তাই শুধু ইরানের মাটিতে নয়—তার ছাপ এখন আমেরিকার তেলভাণ্ডারেও স্পষ্ট।