বাংলাদেশের সৌর সম্ভাবনায় চীনের সোলার অর্থনীতি, বদলাতে পারে জ্বালানি বাজার?

বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, বাড়ছে জ্বালানি আমদানির ব্যয়ও। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য সৌরবিদ্যুৎ কেবল পরিবেশবান্ধব জ্বালানির বিকল্প নয়। এটি তৈরি করছে জ্বালানি ব্যয় কমানোর নতুন পথ। এই সম্ভাবনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে চীনের সোলার অর্থনীতি। সৌরপ্যানেল, সেল, ওয়েফার থেকে শুরু করে ব্যাটারি ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তির বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় আধিপত্য এখন চীনের হাতেই। আর বাংলাদেশের জন্যও তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করছে চীন।

আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থা আইআরইএনএর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে চীনে রেকর্ড ২৭৭ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা যুক্ত হয়েছে। একই বছরে দেশটিতে বড় আকারের সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় ব্যয় ছিল প্রায় ৩ দশমিক ৩ মার্কিন সেন্ট। যেখানে বৈশ্বিক গড় ছিল ৪ দশমিক ৩ সেন্ট। উৎপাদন থেকে সরবরাহ পর্যন্ত সমন্বিত শিল্পব্যবস্থা এবং বৃহৎ উৎপাদন সক্ষমতা চীনের সৌরবিদ্যুতের ব্যয় কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বিশ্বের মোট সক্ষমতার ৪৬% এখন চীনের দখলে। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশেও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের নীতিগত উদ্যোগ রয়েছে। ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, শিল্পকারখানায় সৌরপ্যানেল স্থাপন এবং নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহের সুযোগ এ খাতকে এগিয়ে নেওয়ার পথ তৈরি করছে। ফলে চীনের সৌরপ্রযুক্তি ও বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানির চাহিদার মধ্যে তৈরি হচ্ছে অর্থনৈতিক সংযোগ।

সৌরবিদ্যুতের বিশ্ববাজারে চীনের আধিপত্য

বিশ্বের সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহব্যবস্থায় চীনের অবস্থান এখন অত্যন্ত শক্তিশালী। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আইইএ ২০২২ সালের এক বিশ্লেষণে জানায়, সৌরপ্যানেল উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপ ‘পলিসিলিকন, ইনগট, ওয়েফার, সেল ও মডিউল’ জুড়ে বৈশ্বিক উৎপাদন সক্ষমতার ৮০ শতাংশের বেশি ছিল চীনে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০১১ সাল থেকে সৌরশিল্পের বিভিন্ন ধাপে চীনে ৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ হয়েছে। সেই সাথে তৈরি হয়েছে ৩ লাখের বেশি কর্মসংস্থান।

পুরো সাপ্লাই চেইন চীনের দখলে বলেই আজ সোলার এত সস্তা। ছবি: সংগৃহীত

এই অবস্থানের পেছনে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, বড় উৎপাদন কারখানা, প্রযুক্তির উন্নয়ন, দক্ষ সরবরাহব্যবস্থা এবং বিপুল অভ্যন্তরীণ চাহিদা। সৌরপ্যানেলের কাঁচামাল থেকে চূড়ান্ত পণ্য পর্যন্ত একই শিল্পব্যবস্থার মধ্যে উৎপাদন করা গেলে পরিবহন, সংগ্রহ ও অন্যান্য খরচ কমানো সম্ভব হয়। উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতি ইউনিট পণ্যের ব্যয়ও কমতে পারে। এই শুধু চীন নয়, প্রভাব পড়ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাজারেও। আগে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে প্রাথমিক বিনিয়োগ ছিল অনেক বেশি। তাই অনেক প্রতিষ্ঠানে ও উদ্যোক্তাদের জন্য এটি মোটেও সহজলভ্য ছিল না। প্রযুক্তির উন্নয়নে কমেছে উৎপাদন ব্যয়। ফলে এখন বিভিন্ন দেশে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা বাড়ছে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও চীনের এই উৎপাদন সক্ষমতা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের দেশের সৌরবিদ্যুৎ খাত সম্প্রসারণে প্যানেল, ইনভার্টার, ব্যাটারি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতির সরবরাহের ক্ষেত্রে দাম বড় ভূমিকা রাখে। তবে চীনে উৎপাদন ব্যয় কম হলেই যে বাংলাদেশের বাজারেও দাম কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। পরিবহন, শুল্ক, অর্থায়ন, স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ ও বিনিময় হারের মতো বিষয়ও এসব প্রকল্পের মোট ব্যয় নির্ধারণ করে।

বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা কতটা?

বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের বড় সুযোগ রয়েছে ভবনের ছাদে। ঘনবসতিপূর্ণ দেশে বড় সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য কঠিন হতে পারে উপযুক্ত জমি পাওয়া। কিন্তু শিল্পকারখানা, বাণিজ্যিক ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য স্থাপনার ছাদ কাজে লাগতে পারে। নতুন জমি অধিগ্রহণ ছাড়াই এখানেই সুযোগ রয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের।

তৈরি পোশাক, বস্ত্র, ওষুধ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও অন্যান্য শিল্পে বিদ্যুতের চাহিদা থাকে বেশ। আর মজার ব্যপার হচ্ছে, এসব কারখানার ছাদে পর্যাপ্ত জায়গা আছে। তারা নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করে গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমাতে পারে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে বিদ্যুৎ ব্যয় নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়। তবে প্রকৃত ব্যায় নির্ভর করবে স্থাপনের খরচ, দিনের বিদ্যুৎ ব্যবহার, ঋণের সুদ, সিস্টেমের কার্যকারিতা ও রক্ষণাবেক্ষণের ওপর।

বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্টে নেট মিটারিং নির্দেশিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় গ্রাহক নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করতে পারেন। বিদ্যুৎ বিভাগের অধীন টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ‘স্রেডার’। সেখানে প্রকাশিত এক তথ্যে বলা হয়েছে, দেশের ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার নেটওয়ার্কে ৪ হাজার ৪৯০টির বেশি নেট-মিটারড ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা যুক্ত হয়েছে। এসব ব্যবস্থার মোট সক্ষমতা প্রায় ২১৪ মেগাওয়াট।

বাংলাদেশ সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা। ছবি: স্রেডা

এই পরিসংখ্যান সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের বাস্তব ভিত্তি তুলে ধরে। তবে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বর্তমান সক্ষমতা এবং দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন বা চাহিদার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সুতরাং এ খাতের প্রবৃদ্ধি মূল্যায়নে শুধু স্থাপিত সক্ষমতা নয়। প্রকৃত উৎপাদন, গ্রিডে সরবরাহ, বিনিয়োগ এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

নীতিতে গুরুত্ব পাচ্ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানি

বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতেও সৌরবিদ্যুতের প্রসারের ওপর গুরুত্ব রয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার নীতিগত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৩০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। নীতিতে বিনিয়োগে প্রণোদনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উপকরণ আমদানিতে সুবিধা এবং ব্যাটারি-ভিত্তিক জ্বালানি সংরক্ষণব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ রয়েছে।

বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতিতেও সৌরবিদ্যুতের প্রসারের ওপর গুরুত্ব রয়েছে। ছবি: সংগৃহীত

লক্ষ্য অর্জনে শুধু বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, শিল্পকারখানায় নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ও গ্রিডের সঙ্গে সমন্বয়। তাহলেই কেবল প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ সংরক্ষণের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এ ক্ষেত্রে চীনের তৈরি সৌরপ্যানেল, ইনভার্টার ও ব্যাটারি বাংলাদেশের প্রকল্পগুলোতে ব্যবহার করা যেতে পারে।

তবে ব্যবধান কমাতে হবে নীতিগত লক্ষ্য আর বাস্তবায়নের মধ্যে। আর তার জন্য প্রয়োজন বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা। সেই সাথে বাড়াতে হবে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থার সক্ষমতা। সেই সাথে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নেরও সুযোগ তৈরি করা জরুরি। একই সাথে নেট মিটারিংয়ের নিয়ম, বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ এবং গ্রিডে সংযোগ বিষয়ে গ্রাহকদের স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে।

চীনের প্রযুক্তি কি বাংলাদেশের শিল্পে নতুন সুযোগ তৈরি করবে?

চীনের সোলার অর্থনীতির প্রভাব বাংলাদেশের জন্য কেবল সৌরপ্যানেল আমদানিতে সীমাবদ্ধ নয়। দীর্ঘ মেয়াদে এ প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সেবা, স্থাপন, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রকৌশল এবং যন্ত্রাংশ উৎপাদনের বাজারও গড়ে উঠতে পারে।

সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে প্যানেলের পাশাপাশি প্রয়োজন হয় ইনভার্টার, কেবল, মাউন্টিং কাঠামো, সুরক্ষা সরঞ্জাম, পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং দক্ষ জনবল। এগুলোর স্থানীয় উৎপাদন সম্ভব কি না, তা নিয়ে শিল্পনীতি ও বিনিয়োগ পরিকল্পনায় আলোচনা করা যেতে পারে। এসব সম্ভাবনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন বাজারের আকার, উৎপাদন ব্যয়, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, মাননিয়ন্ত্রণ ও বিনিয়োগের বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ বা প্রযুক্তিগত অংশীদারত্বও হতে পারে একটি সম্ভাব্য পথ। এতে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণের দক্ষতা অর্জন করতে পারে। পাশাপাশি প্রশিক্ষিত প্রকৌশলী, টেকনিশিয়ান এবং সেবা প্রদানকারীদের চাহিদা বাড়তে পারে।

দেশে কৃষি ও জ্বালানি নিরাপত্তা একসাথে নিশ্চিত করছে সোলার ইরিগেশন। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের জন্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ কোনটি? শুধু আমদানিকারক হয়ে থাকা, নাকি ধীরে ধীরে সৌরপ্রযুক্তির স্থানীয় মূল্য সংযোজন বাড়ানো? শুরুতে আমদানি করা পণ্য ব্যবহার করে বাজার সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। এরপর চাহিদা ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা বিবেচনায় স্থানীয় উৎপাদন, সংযোজন এবং যন্ত্রাংশ সরবরাহের দিকে এগোনো সম্ভব। তবে যৌথ উদ্যোগ হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযুক্তি স্থানান্তর বা কর্মসংস্থান নিশ্চিত হবে না। চুক্তির শর্ত, স্থানীয় উপাদানের ব্যবহার, কর্মীদের প্রশিক্ষণ এবং গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগের বিষয়গুলো স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশের সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা চীনের সোলার অর্থনীতির সঙ্গে নতুন অর্থনৈতিক সম্পর্ক তৈরির সুযোগ দিচ্ছে। তবে সস্তা পণ্য আমদানি করাই চূড়ান্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। প্রযুক্তির সাশ্রয়ী ব্যবহার, স্থানীয় দক্ষতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং সরবরাহব্যবস্থার ঝুঁকি কমানোর মাধ্যমে এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। চীনের এই সৌরশিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা বাংলাদেশের জন্য শুধু আমদানির সুযোগ নয়। এটি জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা এবং সবুজ অর্থনীতির বিকাশেও ভূমিকা রাখতে পারে।