এটিই কি বছরের সেরা আলিঙ্গন?

দৃশ্যধারণে নানাভাবে এসেছেন প্রীতম ও ফারিণ। ছবি: চরকি

মেস বা হোস্টেলের কিছু চিরায়ত সত্যের মতো ঘটনা আছে। সেগুলো ৫ বা ১০ বছর আগে যেমন ঘটত, তেমনি ঘটে এখনও। সেই রকম একটি ঘটনা নিয়েই শুরুর দৃশ্য। এবং সেটি বিনোদিত হওয়ার মতোই। বিশেষ করে যারা আগে হলে–মেসে–হোস্টেলে থেকেছেন জীবনের কোনো না কোনো সময়, তারা এর সঙ্গে সহজে যুক্ত হতে পারবেন। শুরুর দৃশ্য তাই একই সঙ্গে বিনোদনদায়ী ও ত্রুটিমুক্ত। এ নিয়ে অভিযোগের আসলে কোনো জায়গা নেই।

কথা হচ্ছিল ‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া’ নিয়ে। গত ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম চরকি’তে চলছে মিনিস্ট্রি অফ লাভ-এর এই দ্বিতীয় সিনেমা। এর পরিচালক শিহাব শাহীন। প্রেম বা ভালোবাসাকে উপজীব্য করে তৈরি করা কনটেন্টে শিহাব শাহীনের সুখ্যাতি দীর্ঘদিন ধরেই। ফলে ‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া’ নিয়ে আগ্রহ জেগেছিলই। সেই হিসাব কষেই দেখতে বসা।

গায়ক থেকে রোমান্টিক অভিনেতা হিসেবেও দুর্দান্ত প্রীতম। ছবি: চরকি

সিনেমাটির কাহিনি নিয়ে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মটি বলছে, ‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া’ একটি স্পর্শের গল্প। জীবনের প্রয়োজনে দূরে যাওয়ার, আবার অনুভূতির আলোড়নে ফিরে আসার গল্প। লং ডিসট্যান্স রিলেশনশিপে পরস্পর থেকে হাজারো মাইল দূরে অবস্থানরত প্রেমিক–প্রেমিকার গল্প। দূরত্ব কীভাবে সম্পর্কে ক্লেদ, সন্দেহ, অবিশ্বাস, রাগ, ক্ষোভ, বিচ্ছেদ ঘটায়—তার গল্প। ‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া’ একটি আলিঙ্গনের গল্প।

এখন প্রশ্ন হলো, এটি কি বিশচব্বিশের সেরা আলিঙ্গনের গল্প হতে পারবে? চলুন, এর উত্তর খোঁজা যাক।

সিনেমার শুরুর দৃশ্য নিয়ে লেখার শুরুতেই আলোচনা হয়ে গেছে। এরপর এসেছে চালচুলোহীন এক যুবকের বেড়ে ওঠার ঘটনাবলী। এই যুবকই মূলত ভালোবাসার গল্পটির প্রেমিকপুরুষ। প্রেমিকার সঙ্গে প্রেমিকের দেখা হয় সেই চিরায়ত বাংলা সিনেমার নিয়মেই, প্রেমিকাকে একটি অস্বস্তিকর পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার করার দৃশ্য দিয়ে। তবে তাতে অতিনাটকীয় কিছু নেই। নেই তুমুল ফাইট। বরং আছে প্রেমিকাকে নিয়ে প্রেমিকের প্রাণ বাঁচানো দৌড়!

এরকম বেশ কিছু দৃশ্যে বেশ বাস্তবানুগভাবেই তৈরি করেছেন পরিচালক শিহাব শাহীন। ফলে প্রেম গড়ে ওঠার গল্পটি দেখতে বিরক্ত লাগে না। বরং চাইলে প্রেমিক বা প্রেমিকার জায়গায় একজন দর্শক নিজেকে বসিয়ে নিতে পারবেন। এই প্রেমে সংকট আছে, তা থেকে উত্তরণে জন্য নিতান্ত মধ্যবিত্তের আশপাশে দেখা চিরচেনা পথ অবলম্বনের চিত্রায়ন আছে।

মূলত প্রেমিক ও প্রেমিকার চরিত্রটিকে ঘিরেই এগিয়ে গেছে ‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া’। এই সিনেমার মধ্যে দিয়ে প্রথমবারের মতো জুটি বেঁধেছেন প্রীতম হাসান ও তাসনিয়া ফারিণ, স্বাভাবিকভাবেই যথাক্রমে প্রেমিক ও প্রেমিকার চরিত্রে। অভিনয়ের দিক থেকে এই জুটির প্রশংসা করতেই হয়। মা–বাবার দেখা না পাওয়া একজন নিজে নিজে বেড়ে ওঠা যুবকের চরিত্রে দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন প্রীতম। তাতে মেদ ছিল না একেবারেই। অন্যদিকে ফারিণের চরিত্রে মফস্বলের একজন তরুণীর সংগ্রাম ফুটে উঠেছে অবলীলায়। ভুল তাঁর জীবনেরই অংশ। সেই ভুলকে পাথেয় করেই এগিয়ে যাওয়া বা ফের প্রেমের সুবাসে মন ভাসানো এমন তরুণীর দেখা পাওয়া এই সমাজে দুর্লভ নয় একেবারেই। আর এই প্রেমে পড়া এবং তাতে দেহ–মন উৎসর্গ করার চিত্রায়নটি পরিচালক বেশ দক্ষতার সঙ্গে করেছেন। এতে আন্দোলিত না হওয়ার উপায় নেই একেবারেই।      

স্নিগ্ধ ফারিণ। ছবি: চরকি

তাই বলে পুরো সিনেমার গল্প সব সময়ই যে উত্তম ছন্দে এগিয়েছে, তা কিন্তু নয়। গল্পে সংকট আসে। সম্পর্কে আসে সন্দেহ, অবিশ্বাস ও রাগ, তা থেকে বিচ্ছেদও জন্মায়। তবে গল্পে সন্দেহের গোড়া যেভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে, বর্তমান যুগে এসে তা কিছুটা বেমানান। বিদেশে পড়তে যাওয়া এবং সেখানে থাকার যে বাস্তবতা—সেই সম্পর্কে এখন অনেক তরুণ–তরুণীই ভালোভাবে ওয়াকিবহাল। যদিও চিত্রনাট্যে সন্দেহ সৃষ্টির কারণের যৌক্তিক ভিত্তি তৈরির চেষ্টা হয়েছে বেশ। তবে কেন জানি সেই ক্ষণিকের সন্দেহ বা রাগ বা মনোমালিন্যকে এক বছর মেয়াদী বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে মেনে নিতে কিছুটা কষ্টই হয়। তা যতোই আপনি লং ডিসটেন্স রিলেশনশিপকে নিয়ে আসুন না কেন! কারণ সিনেমার শুরু থেকে অর্ধেক পর্যন্ত যে মানব–মানবীর মধ্যে আপনি সাগরের মতো গভীরতার আবেগীয় উপস্থিতিকে দৃশ্যমান করেছেন, সেখানে অভিমানের পাহাড় দেখাতে চাইলে মনোমালিন্যের একাধিক ঘটনাকে সামনে আনার প্রয়োজন ছিল। নইলে বর্ষকালব্যাপী বিচ্ছেদের ভিত্তিটিকে যৌক্তিক মনে হয় না।

তবে হ্যাঁ, এই প্রেমের গড়ে ওঠা এবং বিচ্ছেদ থেকে আবার প্রেমে ফেরার ঘটনাক্রমে পরিচালক শিহাব শাহীন সত্যিই মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন। বিশেষ করে দুই বিপরীত মেরুতে চলে যাওয়া দুটি মানুষ যেভাবে আবার আলিঙ্গনাবদ্ধ হলো, সেটি এক শব্দে— ‘ম্যাজিক্যাল’। আবেগের গল্পে তো এমন ম্যাজিকই চাই, যা দর্শকের মনেও প্রেমের দোলা দিয়ে যাবে। সিনেমার শেষে স্ক্রিনে ভেসে ওঠা লাইন দেখে একমত হতেই হবে যে, কখনো কখনো জীবনে সত্যিই শুধু একটি আলিঙ্গনের প্রয়োজন হয়! সেদিক থেকে পরিচালক সফল। সফল প্রীতম হাসান ও তাসনিয়া ফারিণও।

প্রীতম ও ফারিণ। ছবি: চরকি

যে ক্ল্যাইম্যাক্সে শেষ হয় ‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া’, সেটি মাথায় রেখেই বলতে হয় ১৪৪ মিনিটের এই সিনেমাটির দৈর্ঘ্য আরেকটু কমিয়ে জমাট করা যেত। কারণ ক্লাইম্যাক্সেই স্পষ্ট যে, ভালোলাগা তৈরিতে সব সময় দীর্ঘ মুহূর্তের প্রয়োজন হয় না। প্রধান দুটি চরিত্রের পাশাপাশি সহঅভিনয়শিল্পীদের দিকেও একটু নজর দেওয়া প্রয়োজন ছিল, তাতে ভালো বৈ মন্দ হতো না। অবশ্য ভালোর তো কোনো শেষ নেই!

সেই হিসাব মাথায় নিলে বলাই যায় যে, দেখতেই পারেন ‘কাছের মানুষ দূরে থুইয়া’। কিছু জায়গায় ঠোক্কড় খেলেও সিনেমাশেষে একটি ভালো লাগায় মন আচ্ছন্ন হয়ে থাকবেই। এটিকে এখনই বছরের সেরা আলিঙ্গনের গল্প না বলা গেলেও, অন্যতম সেরা তো অবশ্যই। হয়তো এই সিনেমা দেখার পর আফসোসও সঙ্গী হতে পারে। অসময়ে শেষ হয়ে যাওয়া অতীতের কত সম্পর্ক যে একটিমাত্র আলিঙ্গনেই বেঁচে উঠতে পারত না, তা কে বলতে পারে!

রেটিং: ৩.৯/৫
পরিচালক: শিহাব শাহীন
গল্প: জাহান সুলতানা
চিত্রনাট্য: শিহাব শাহীন ও জাহান সুলতানা
অভিনয়শিল্পী: তাসনিয়া ফারিণ, প্রীতম হাসান, সমাপ্তি মাশুক, রূপন্তী আকিদ, খলিলুর রহমান কাদেরী, শিরিন আলম, শুভজিৎ ভৌমিক ও শাহীন শাহনেওয়াজ প্রমুখ
ভাষা: বাংলা
ধরন: রোমান্স
মুক্তি: ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪/ চরকি