দেশের গণ্ডি পেরিয়ে অনেক আগে থেকেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সমাদৃত হয়ে আসছে ইরানি সিনেমা। বিশেষ করে তাঁদের সহজ নির্মাণশৈলী ও শক্তিশালী গল্পেই মোহাবিষ্ট করে রাখে দর্শকদের। একজন তরুণ নির্মাতা কিংবা সিনেপ্রেমীর কাছে দেশটির চলচ্চিত্র নির্মাতারা তাই আজ সবচেয়ে পছন্দের তালিকায়। উল্লেখ করা যায় কত কত নাম! আব্বাস কিয়ারোস্তামি, দারিয়ুশ মেহেরজুই, মোহসেন মাখ্মলবফ, জাফর পানাহি, মাজিদ মাজিদি, বাহমান গবাদি, আসগর ফরহাদি—তাঁরা একেকজন এই শতাব্দীর কিংবদন্তি। তাঁদের মধ্যে ২০১৬ সালে মারা গেছেন আব্বাস কিয়ারোস্তামি। আর শনিবার (১৪ অক্টোবর) নিজ বাড়িতে ছুরিকাঘাতে সস্ত্রীক খুন হলেন নির্মাতা দারিয়ুশ মেহেরজুই।
অন্য যাঁরা জীবিত আছেন তাঁরা হয়ে আছেন কোণঠাসা! তাঁদের অভিযোগ, সিনেমা নির্মাণ ও প্রতিবাদী মানসিকতার কারণেই রাষ্ট্রীয় রোষানলের শিকার হচ্ছেন তাঁরা। সর্বশেষ এই বিপদে পড়েছেন নির্মাতা জাফর পানাহি। প্রায় সাত মাস কারাবন্দি থাকার পর অনশন ধর্মঘট করলে জামিনে ছাড়া পান তিনি। এর বাইরে কারাবন্দি আছেন নির্মাতা সাঈদ রুস্তাই ও তাঁর প্রযোজক জাভেদ নরুজবেগি।
সম্প্রতি নির্মাতা দারিয়ুশের স্ত্রী ভাহিদেহ সোশ্যাল মিডিয়ার এক পোস্টে জানিয়েছিলেন, প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার কথা। এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে এমন আরও হুমকি এসেছে বলেও জানিয়েছিলেন। সবশেষ ছুরি দিয়ে হত্যার কথা বলা হলেও সরকার এ বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেয়নি।
এমন হত্যা হুমকির পেছনে তাঁর দুর্দান্ত কিছু সিনেমাই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে ধারণা করছেন অনেকে। বিশেষত, আদর্শিক জায়গায় সরকারও ছিল এই নির্মাতার বিপক্ষে। ‘দ্য কাউ’, ‘দ্য পিয়ার ট্রি’, ‘দ্য টেনেন্টস’সহ তাঁর সব ছবিই কমবেশি বাধাগ্রস্ত করার প্রচেষ্টা ছিল। বিশেষ করে সেন্সর বোর্ডের নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছিল সেগুলো। সারাটা জীবন সেন্সর বোর্ডের সঙ্গে চলেছে তাঁর ঠান্ডা যুদ্ধ।
সবশেষ ‘লামাইনর’ ছবিটিকেও নানাভাবে দমিয়ে রাখার চেষ্টা নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে তুমুল সমালোচনা করেন দারিয়ুশ। প্রকাশ করেন ভিডিও বার্তা।
দারিয়ুশ তাঁর চলচ্চিত্রের বাইরেও মুখ খুলেছেন ইরানের ইসলামী শাসন ব্যবস্থা নিয়ে। তোপ দাগিয়েছিলেন সরকার প্রধানদের দিকে।
সরকারের বিরুদ্ধাচারণ, ইসলামী শাসন ব্যবস্থার সমালোচনা, প্রথাবিরোধী মন্তব্যর মতো কোনো একটি বিষয় তাঁর মৃত্যুর কারণ কিনা সেটা নিয়েও চলছে আলোচনা। একইভাবে সরকারও তাঁর নিরাপত্তার বিষয়ে উদাসীন ছিল বলে প্রশ্ন উঠেছে।
একটা প্রবাদ রয়েছে—আদর্শের মৃত্যু নেই। তেমনি এই কৃতি দারিয়ুশের জীবনাবসান হলেও তাঁর কীর্তিগুলো অমর, মুছে ফেলতে পারেনি হত্যাকারী। ষাটের দশক থেকে নিয়মিত সিনেমা নির্মাণ করা দারিয়ুশের সৃষ্টিকর্ম আজীবন তরুণ নির্মাতাদের জন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে থেকে যাবে।
সূত্র: হলিউড রিপোর্টার, থাইজার