আফরিন যেভাবে হয়ে ওঠে ‘মাইটি আফরিন’

আফরিন—নদীকূলে করে বাস। আর সব নদীলগ্ন মানুষের মতোই ব্রহ্মপুত্রের স্নেহ ও রোষ দুইয়েরই অভিজ্ঞতায় পূর্ণ সে। মা–হারা ১২ বছর বয়সী মেয়েটিকে ভুগতে হয় বন্যায়, যা নদীমাতৃক বাংলাদেশের এক বড় বাস্তবতা। সাথে যোগ হয় ঘরছাড়া বাবার খোঁজে এক অভিযান, যা তাকে রাজধানী শহরে টেনে আনে। এই বন্যা ও শহুরে বাস্তবতা ছোট্ট আফরিনকে পরিণত করে ‘মাইটি আফরিন’–এ।

বাংলার মানুষের কাছে নদীর আরেক নাম জীবন। এই নদী আমাদের সুখের উল্লাসে ভাসায়, আবার সব কেড়ে নিয়ে অতল গভীরে ডুবায়। শত–সহস্র বছর ধরে এই অঞ্চলের মানুষ নদীকে উপজীব্য করে বেঁচে থাকার কৌশল আয়ত্ত করেছে। তবে ইদানীং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নদীমাতৃক এই অঞ্চলের মানুষদের সম্মুখীন হতে হচ্ছে নতুন সমস্যার। ফলে আফরিনের মতো কম-বেশি সবাইকেই হয়ে উঠতে হয় নিজের চেয়েও বড় কিছু।

বাংলার নদী, জলবায়ু পরিবর্তন, জনপদের গল্প ও লড়াই নিয়েই প্রামাণ্যচিত্র ‘মাইটি আফরিন—ইন দ্য টাইম অব ফ্লাড’। এটি তৈরি করেছেন গ্রিসের চলচ্চিত্র নির্মাতা এঞ্জেলোস রালিস। দ্বাবিংশতম ঢাকা চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হচ্ছে প্রামাণ্যচিত্রটি। গতকাল (২৪ জানুয়ারি) ঢাকার আলিয়ঁস ফ্রঁসেজে প্রামাণ্যচিত্রটির প্রথম প্রদর্শনী হয়। আজ বিকাল ৫টায় জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে দ্বিতীয় প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়েছে। 

মা–হারা আফরিনের সঙ্গী কেবল ব্রহ্মপুত্র নদ, কাদামাটি আর পানি। ছবি: সংগৃহীত

ব্রহ্মপুত্র নদের পারে ছোট্ট বাড়িতে থাকে ১২ বছর বয়সী আফরিন। ছোটবেলায় মাকে হারিয়েছে। আর আফরিনকে একা রেখে চলে গেছে তার বাবা। আফরিনের সঙ্গী কেবল ব্রহ্মপুত্র নদ, কাদামাটি আর পানি। নদের কূল ঘেঁষে বাড়ি হওয়ায় বর্ষা মৌসুমে তলিয়ে যায় তার ঘর। পানির সাথে সাথে বাড়তে থাকে দুর্দশাও। তবে হাল ছাড়ার মানুষ নয় আফরিন। বন্যার পানির মধ্যেই বেঁচে থাকার কৌশল রপ্ত করে নেয় সে। পানি বাড়ির উঠান থেকে ওঠে আসে ঘরের চালা পর্যন্ত।

ঘর–ছাড়া বাবার খোঁজে রাজধানী ঢাকা শহরে আসে আফরিন। ছবি: সংগৃহীত

আফরিন মনস্থির করে—সে তার বাবাকে খুঁজে বের করবে। সে উদ্দেশে রওনা হয় ঢাকায়। শুরু হয় নতুন সংগ্রাম। এই যাত্রায় যুক্ত হয় ঢাকার বন্ধুরা। নদীর পারের জীবনের মতো এখানেও কৌশলী হতে হয় তাকে। সংগ্রাম যেন পিছু ছাড়ে না। সেই সংগ্রাম ছোট্ট আফরিনকে বড়দের মতো করে ভাবতে–চলতে শেখায়। অজান্তেই ছাড়িয়ে যায় সে নিজের বয়সকে।

প্রামাণ্যচিত্রটি ইতিমধ্যেই বেশ কিছু আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার পেয়েছে। এশিয়ার স্বনামধন্য চলচ্চিত্র উৎসব ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল ইন্ডিয়ায় প্রদর্শিত হয়। ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরাম আয়োজিত ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে সেরা পরিবেশগত চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেয়েছে। এ ছাড়া ইন্ডি আউটলুক ডটকমের জরিপে সেরা ২০টি চলচ্চিত্রের তালিকায় রয়েছে ‘মাইটি আফরিন—ইন দ্য টাইম অব ফ্লাড’।

প্রামাণ্যচিত্রটির নির্মাতা এঞ্জেলোস রালিস জানান, তিনি বাংলাদেশের বন্যা নিয়ে জানতে পারেন খবরের কাগজের মাধ্যমে। সেখানে লেখা ছিল—ব্রহ্মপুত্র নদের পারের মানুষদের বছরে ছয় মাস পানির সাথে যুদ্ধ করে বাঁচতে হয়। অন্যদিকে, গ্রিসে কখনও বন্যা হলে সবাই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। এটাই তাকে বাংলাদেশ নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী করে তোলে। এর পর প্রামাণ্যচিত্রটির প্রযোজক মারিয়া ডেল মারকে সাথে নিয়ে চলে আসেন বাংলাদেশে। 

নির্মাতা আরও জানান, আসাম ও বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি একটি এলাকায় এই প্রামাণ্যচিত্রের শুটিং হয়েছে। নির্দেশক দেখেন আফরিন একাই বন্যার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই এলাকার মানুষ বন্যা সতর্কতার জন্য কোনো সংকেত পান না। পানির উচ্চতা দেখে বুঝতে হয় বন্যা আসার আগাম সংকেত। নিতে হয় প্রস্তুতি। তবে বিদ্যুৎ না থাকায় এ কাজও অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। রালিস এই গল্পকেই ক্যামেরায় তুলে ধরবেন বলে স্থির করেন।

রালিস দুই সপ্তাহের মধ্যে তাঁর ক্যামেরা নিয়ে ফিরে আসেন বাংলাদেশে। এসেই চলে যান তাঁর গন্তব্যে। বন্যার পানি আসছে, চলছে প্রস্তুতি—এমন এক সময়ে নির্দেশক দেখা পান আফরিনের। নির্দেশক জানান, আফরিনের মধ্যে এক ধরনের শক্তি তাঁকে আকৃষ্ট করে। তবে সেটা শারীরিক শক্তি নয়, মানসিক। এর পর টানা ৫ বছর ধরে বন্যার সময়ে এই প্রামাণ্যচিত্রের শুটিং হয়।

নির্দেশক রালিস জানান, তিনি বিভিন্ন সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শুট করেছেন। তবে এ সময়টা কঠিন ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই অঞ্চলের জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বের প্রথম সারির সাতটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। সামনের দিনগুলোতে জরুরি পদক্ষেপ না নিলে অবস্থা আরও খারাপ হবে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর উচিত এই মানুষগুলোর সাহায্যে এগিয়ে আসা। 

‘মাইটি আফরিন—ইন দ্য টাইম অব ফ্লাড’ সিনেমাটি সারা বাংলাদেশে দেখানোর ইচ্ছা রয়েছে নির্দেশকের। এ ছাড়া যেখানে শুটিং হয়েছে, সেখানেও এটি দেখাতে চান তিনি। জার্মানি, ফ্রান্স ও গ্রিসের বেশ কিছু টেলিভিশনে প্রামাণ্যচিত্রটি প্রদর্শিত হবে। সেখানে লাখও মানুষ এটি দেখার সুযোগ পাবেন। বিনোদনের বাইরে বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে বিশ্বের মানুষ আরও সচেতন হবেন এই আশাই ব্যক্ত করেছেন নির্দেশক এঞ্জেলোস রালিস।

ছবিটির পোস্টার