নায়করাজ রাজ্জাকের জন্ম ১৯৪২ সালের ২৩ জানুয়ারি। অবিভক্ত ভারতের কলকাতার কালীগঞ্জের নাকতলায় জন্মেছিলেন তিনি।
ছোটবেলা থেকেই চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহী ছিলেন রাজ্জাক। তরুণ বয়সে তিনি বম্বে (মুম্বাই) চলে গিয়েছিলেন। প্রায় দুই মাস সেখানে ছিলেন। তবে যে স্বপ্ন নিয়ে গিয়েছিলেন তা পূরণ করতে পারেননি। ফের ফিরে আসেন কলকাতায়। অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে দিন কাটতে থাকে তাঁর। কিন্তু অভিনয়ের ঝোঁক ভুলতে পারেননি। পরিচালকদের পেছনে ঘুরতে থাকেন, সুযোগ আসে না।
কিছুদিন চাকরিও করেছিলেন কলকাতায়। মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিয়েও করেন। স্ত্রী লক্ষ্মীকে নিয়ে কাটতে থাকে দিন, কিন্তু অভিনয়ের নেশা যেন কাটে না। একসময় ছেলে বাপ্পারাজ ও স্ত্রীকে নিয়ে কলকাতা ছেড়ে চলে আসেন ঢাকা শহরে। তখনকার ঢাকায় কেউ তাঁর পরিচিত ছিল না। সম্বল ছিল একটি চিঠি। কলকাতা থেকে ঢাকাই চলচ্চিত্র পরিচালক আবদুল জব্বার খানের কাছে সেখানকার নাট্যপরিচালক পীযুষ বসু এই চিঠি লিখে দিয়েছিলেন। বিষয় ছিল—রাজ্জাক যেন অভিনয় করতে পারেন।
এই চিঠিই ছিল সে সময়ে রাজ্জাকের সম্বল। আর চোখে মুখে ছিল স্বপ্ন। ছিল হতাশাও। অস্থিরতাও ছিল। তারপরও রাজ্জাক হাল ছেড়ে দেননি।
অচেনা শহর ঢাকায় ওই চিঠি নিয়ে দেখা করার পর পরিচালক আবদুল জব্বার খান সেই সময়ের কয়েকজন নামকরা পরিচালকের কাছে রাজ্জাককে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তারপর আবদুল জব্বার খান রাজ্জাককে পাঠিয়েছিলেন ইকবাল ফিল্মসে। সেখান থেকে নির্মিত হয়েছিল ‘উজালা’। কামাল আহমেদ পরিচালিত ‘উজালা’য় সহকারী পরিচালক হিসেবে ঢাকায় নতুন জীবন শুরু করেন রাজ্জাক।
এদিকে, ঢাকায় সে সময়ে ত্রিশ টাকা মাসিক ভাড়ায় রাজ্জাক তাঁর পরিবারকে নিয়ে বাসা ভাড়া নেন কমলাপুরে। ঢাকাই সিনেমায় নায়ক হওয়ার জন্য তখন তাঁর কঠোর সংগ্রাম আরও বেশি করে শুরু হয়।
সহকারী পরিচালক হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য কাজ করতে থাকলেও রাজ্জাকের মন পড়ে থাকত অভিনয়ের প্রতি। তারপর ছোট-ছোট চরিত্রে অভিনয় দিয়ে এ দেশের সিনেমায় ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন রাজ্জাক। সেই সিনেমাগুলো হচ্ছে ‘ডাক বাবু’, ‘কার বউ’, ‘১৩ নম্বর ফেকু ওস্তাগার লেন’।
এক সময়ে সুযোগ এসে যায় তাঁর। বিখ্যাত নির্মাতা জহির রায়হান পরিচালিত ‘বেহুলা’ সিনেমায় নায়ক হিসেবে অভিষেক ঘটে। রাজ্জাক নায়িকা হিসেবে পান সুচন্দাকে।
‘বেহুলা’ দর্শকের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হয়। রাজ্জাক নামটি নায়ক হিসেবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর রাজ্জাক ও সুচন্দাকে জুটি করে জহির রায়হান নির্মাণ করেন ‘আনোয়ারা’। বিখ্যাত লেখক মোহাম্মদ নজিবর রহমান সাহিত্যরত্ন রচিত ‘আনোয়ারা’ উপন্যাস থেকে নির্মিত এ সিনেমায় আনোয়ারার স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করার পর দর্শকরা পেয়ে যায় নতুন এক রাজ্জাককে।
১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে ভারত থেকে ছবি আসা নিষিদ্ধ হয়। উত্তম-সুচিত্রা জুটি তখনও দুই বাংলায়ই জনপ্রিয়। হঠাৎ সেসব ছবি এ দেশে না আসায় উত্তম-সুচিত্রা জুটির বিকল্প খুঁজতে লাগল মানুষ। রাজ্জাক-সুচন্দা হয়ে উঠলেন সেই বিকল্প।
নায়ক হিসেবে রাজ্জাক-সুচন্দা, রাজ্জাক-কবরী ও রাজ্জাক-ববিতা ও রাজ্জাক-শাবানার অনেক সিনেমা দর্শকহৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে, যা রাজ্জাককে ঢালিউডের নায়করাজ উপাধিতে ভূষিত করেছে। সিনে-পত্রিকা ‘চিত্রালী’র সম্পাদক আহমদ জামান চৌধুরী তাঁকে এই উপাধি দিয়েছিলেন।
রাজ্জাক অভিনীত চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘আখেরি স্টেশন’, ‘১৩নং ফেকু ওস্তাগার লেন’, ‘কাগজের নৌকা’, ‘বেহুলা’, ‘আগুন নিয়ে খেলা’, ‘আনোয়ারা’, ‘দুই ভাই’, ‘সুয়োরাণী দুয়োরাণী’, ‘ময়নামতি’, ‘আগন্তুক’, ‘নীল আকাশের নীচে’, ‘যে আগুনে পুড়ি’, ‘ক খ গ ঘ ঙ’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘পীচ ঢালা পথ’, ‘দর্পচূর্ণ’, ‘কাঁচ কাটা হীরা’, ‘দ্বীপ নেভে নাই’, ‘স্বরলিপি’, ‘স্মৃতিটুকু থাক’, ‘অশ্রু দিয়ে লেখা’, ‘এরাও মানুষ’ উল্লেখযোগ্য।
ক্যারিয়ারে মোট পাঁচবার শ্রেষ্ঠ অভিনেতার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন নায়করাজ রাজ্জাক। ২০১৩ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাঁকে আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।
২০১৭ সালের ২১ আগস্ট অগণিত ভক্তকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান রাজ্জাক। হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।