‘দাগী আসামির মুক্তি পাওয়া আর মবের মুখে নারী অভিনেতাদের বাধা দেওয়া কাকতালীয় না’

শনিবার (২৫ জানুয়ারি) টাঙ্গাইলের এলেঙ্গায় যাওয়ার কথা ছিল চিত্রনায়িকা পরী মণির। একটি শো-রুম উদ্বোধন করার কথা ছিল তাঁর। কিন্তু খেলাফত মজলিস ও হেফাজতে ইসলামে বাধার মুখে এই আয়োজন বাতিল করা হয়।

গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শুধু পরী মণিই নয়, অভিনেত্রী মেহজাবীন চৌধুরী ও গায়িকা পড়শীও এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন জায়গায় কনসার্ট বন্ধ করতেও ‌‘মব’ সৃষ্টি করে বাধা দেওয়া হয়েছে। সামাজিকমাধ্যমে এসব ঘটনায় নিজেদের হতাশা প্রকাশ করেছেন শিল্পীদের অনেকে। 

এবার পরী মণির ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড়। সামাজিকমাধ্যমে চলচ্চিত্র নির্মাতা গিয়াস উদ্দিন সেলিম তাঁর এক পোস্টে বলেন, ‘এ যে এক মবের মুল্লুক!’

জনপ্রিয় চলচ্চিত্র নির্মাতা আশফাক নিপুণ লেখেন ফেসবুকে লিখেছেন, ‌‘‘মবের প্রতিবাদের মুখে পরী মণির দোকান উদ্বোধন করতে না পারার ক্ষোভ উদগীরণের পরপরই তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা পুরনো মামলায় হাজিরা দিতে না যাওয়ায় গ্রেপ্তারের আদেশ জারি বড়ই কাকতালীয়, সরকার। আবার সাজাপ্রাপ্ত দাগী আসামি সকলের জামিনে বের হয়ে ত্রাস সৃষ্টি করা মোটেও কাকতালীয় না। ঠিক যেমন আদিবাসীদের ওপর সভেরন্টি গ্রুপের হামলাও কাকতালীয় না, আবার নারী অভিনেতাদের তথাকথিত ‘মব’-এর প্রতিবাদের মুখে শো-রুম উদ্বোধন করতে না পারাও এখন আর কাকতালীয় না।’’

আশফাক নিপুণের পোস্টের স্ক্রিনশট

যোগ করে তিনি বলেন, ‘‘কাকতালীয় বা অকাকতালীয় কোনো সরকারই হইয়েন না, জনাব সরকার; কাজের সরকার হন। ‘মব’ ঠ্যাকান। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক করেন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের কুশীলবদের ধরার ব্যবস্থা করেন। নাহলে আপনাদের পায়ের নীচ থেকে মাটি সরে যাওয়াও কাকতালীয় হবে না।’’

এদিকে, ওয়েব ফিল্ম ‘নেটওয়ার্কের বাইরে’র চিত্রনাট্যকার যোবায়েদ আহসান লেখেন, ‘পরী মণিকে টাঙ্গাইল যেতে দেয়া হয়নি। এর আগে মেহজাবীনের সাথেও চিটাগংয়ে একই ধরনের কিছু একটা হয়েছিল। হেফাজতে ইসলাম কি মনে করা শুরু করে দিয়েছেন যে তাদের কথামতোই দেশ চলতে হবে? এর কারণটা আসলে কী? তারা কি মনে করছেন হাসিনাকে তারাই তাড়িয়েছেন। আর কেউ না? অথচ শাপলা চত্বর ঘটনার পর থেকে হাসিনার সাথে আপোষ করে চলা এই সমাজের সবচেয়ে বড় যে অংশটা ছিল তার নাম হেফাজতে ইসলাম।’

যোগ করে তিনি আরও বলেন, ‘‘৩২ কোটি টাকার রেলের জমির কথা বাদই দিলাম, ২০১৮-তে যে আপনারা হাসিনাকে ‘কওমি জননী’ উপাধি দিয়েছিলেন—ভুলে গেছেন? আর এখন হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে যদি ভাবতে শুরু করেন দেশ আপনাদের কথামতো চলবে, তাহলে তো মুশকিল। ভাই, দেশ কীভাবে চলবে এর জন্য ম্যান্ডেট দরকার।’’

যোবায়েদ আহসান আরও বলেন, ‘আপনারা যদি মনে করেন দেশে কোনো নাটক, সিনেমা হবে না, কোনো শিল্পী কোথাও যেতে পারবে না—সেটা আপনারা আপনাদের মেনিফেস্টে দিয়ে ম্যান্ডেট নিয়ে আসেন। দেশের মানুষ যদি ‘ভোট’ দিয়ে বলে যে আপনাদের মেনিফেস্ট অনুযায়ীই দেশ চলবে, আমরা সবাই তাই মেনে নিব। কিন্তু তার আগে এসব হুমকি-ধামকি দিবেন না। মনে রাখবেন, এই দেশে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, প্র‍্যাকটিসিং মুসলিম, নন-প্র‍্যাকটিসিং মুসলিম, আস্তিক, নাস্তিক, শিক্ষিত, অশিক্ষিত, জ্ঞানী, মুর্খ, ধনী, গরীব, শিল্পী, সাহিত্যিক সব ধরনের মানুষ আছে। এদের সবাইকেই থাকতে দিতে হবে, চলতে দিতে হবে, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করতে দিতে হবে।’

যোবায়েদ আহসানের পোস্টের স্ক্রিনশট

তিনি আরও বলেন, ‘একজন নায়িকা আপনার এলাকায় একটা কসমেটিক্সের শো-রুম উদ্ভোধন করতে যাচ্ছে মানে আপনার এলাকার অনেক লোকজনের কাছেই তারও গ্রহণযোগ্যতা আছে। এটা মানতে হবে। আপনাদের পছন্দ না হলেও মানতে হবে। আপনার পছন্দ না হলে আপনি তাকে দেখতে যাইয়েন না, যদি মনে করেন যারা যাচ্ছে তাদের গুনাহ হচ্ছে... তাহলে তাদেরকে ওয়াজ-নসিহত করে বোঝান যে নায়িকা দেখতে যাওয়া ঠিক না। লোকজন তাকে দেখতে না গেলে এমনিতেই তার আর আপনাদের এলাকায় ডাক পড়বে না। কিন্তু কোনোভাবেই অবস্থান কর্মসূচির নামে হুমকি-ধামকি দিয়ে তাকে বাঁধা দিতে পারেন না আপনারা।’

সামাজিকমাধ্যমে পরী মণির ঘটনায় মুখ খুলেছেন আরও অনেকে। এ ছাড়া আশফাক নিপুণ ও যোবায়েদ আহসানের স্ট্যাটাসগুলো ফেসবুকে রীতিমতো ভাইরাল।