প্রথম দিনের শুটিংয়ে দেখেছিলাম স্টারডম কী, সালমান শাহ কী: মিশা সওদাগর

বাংলা চলচ্চিত্রের বরপুত্র সালমান শাহর ৫৪তম জন্মদিন আজ (১৯ সেপ্টেম্বর)। ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তাঁর অকাল চলে যাওয়ার আজও কাঁদায়। কিংবদন্তি এই নায়কের জন্মদিনেও সে আক্ষেপ ঝরল সহঅভিনেতা, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি মিশা সওদাগরের কণ্ঠে। সালমান শাহকে নিয়ে এ অভিনেতার স্মৃতিচারণ থাকছে নিচে—

‘‘সালমান শাহ ছিলেন অসাধারণ গুণী শিল্পী। আয়ু ছিল অল্প, কিন্তু প্রতিভা ছিল বিশাল। আজ তাঁর জন্মদিনে একটা কথাই বলব—তিনি যদি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতেন, তাহলে আমাদের চলচ্চিত্র আরও অনেক দূর এগিয়ে যেত।

আমার বয়স এখন ৫৯। প্রায় ৩৭-৩৮ বছর ধরে কাজ করছি। আমার চোখে ‘পরিবারের শিল্পী’ ছিলেন দুজন—নায়করাজ রাজ্জাক এবং সালমান শাহ। পরিবারের শিল্পী মানে যাকে সবাই ভালোবাসবে—বাড়ির মালিক থেকে শুরু করে গাড়ির ড্রাইভার, এমনকি বাসার কাজের মানুষও। রাজ্জাক সাহেবের পর সেই জায়গা দখল করেছিলেন সালমান শাহ।

ভিলেন হিসেবে আমার প্রথম ছবি করলাম ৯৩-এর সেপ্টেম্বর মাসের ১১ বা ১৯ তারিখ হবে। বান্দরবানে। আমি তখন নায়ক হিসেবে ‘চেতনা’ ও ‘অমরসঙ্গী’ করেছিলাম। তারপরে দু-বছর আমি ব্যবসা করি, ৯১ ও ৯৩। ৯৩-এ আমার অফার ছিল ‘আশা ভালোবাসা’। পরিচালক তমিজ উদ্দীন রিজভী। ছবিতে ভিলেন চরিত্রে আমাকে করতে বলছে। এখানে ডনও ছিল, তখন দুটো-তিনটে ছবি করে বেশ জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ওখানে দুটো ভিলেন ছিল—একটা ছিল মেইন ভিলেন (গ্রামের), আরেকটা ছিল শহরের ভিলেন। তখন দেখলাম স্টারডম কাকে বলে। সালমান শাহ! এর মধ্যে সালমান শাহ সুপারস্টার হয়ে গেছেন। আমার সাথে তখনও পরিচয় হয় নাই, মানে দূরে আমি থাকি। চারজনের রুমে ছিলাম। ওখানে ডন, সালমান শাহ, সামিরা (ওর স্ত্রী), ওখানে শাবরিনা ছিল, আরমান ভাই ছিলেন। পরপর তিন দিন আমি শুটিং যাচ্ছি, সবার আগে আমাকে মেকআপ নিতে হয়। আমি বাসে পড়ি। প্রথম দিন শুটিং হয়নি, সেকেন্ড ডেতেও শুটিং হয় না। থার্ড ডেতে সানলাইট শেষের দিকে। ডিরেক্টর বললেন যে, ‘আপনার শট হবে।’

একটা ক্লোজ-আপ শট। আমাকে যে ডিসট্যান্সটা বলল, তখন আমি গুছিয়ে নিলাম যে, ‘এত ডিসট্যান্সে এই পারফরম্যান্সটা এভাবে করব’! আমারটা ছিল একটা ছোট্ট শট।
তখন যেহেতু আমার সালমান শাহের শটটা হয়ে গেছে, কথাবার্তা চলতেছে, আমার ক্যামেরা নিয়ে দুলাল ভাই ছিলেন আর ছিল দিলু ভাই। আমার একটা শট ছিল, ঝাঁকি দিয়ে বললাম, ‘এই শুয়োরের বাচ্চা!’ শুধু এইটুকু ছিল। সালমান শাহ থেকে আরম্ভ করে সবাই সব চুপ হয়ে গেলেন। মানে, একটা ইকো হয়ে গেল বান্দরবানের পাহাড়ে। তারপরে আমি চুপ, সবাই চুপ। আমি তালির আওয়াজ শুনলাম। সালমান শাহ সামনে এসে বললেন, ‘বিউটিফুল! বিউটিফুল! কংগ্র্যাচুলেশন্স!’ আমাদের ফার্স্ট ইন্ট্রোডাকশন অসাধারণ হলো।

আশা ভালোবাসায় শাবনাজ ও সালমান শাহ। ছবি পরিচালনায়: তমিজ উদ্দীন রিজভীআমার সাথে তাঁর পরিচয় এইভাবে এবং একটা ফাইটও ছিল। আমি সালমান শাহর ব্যালেন্স তখনও জানি না। আমরা যেভাবে ফাইট করি, আমাদের একটা ব্যালেন্স রাখতে হবে। আমরা তো শুধু শুধু মারি না, স্ক্রিনে বিলিভ করার মতো এক্সপ্রেশন দিয়ে থাকি। সালমান শাহ তখন অত ব্যালেন্স করতে পারেননি। অনেক বড় কম্পোজিশন ছিল। আরমান ভাই ফাইট ডিরেক্টর। আমি এখানে একটা হিট করেছিলাম সালমান শাহকে। আমিও ক্যারাটে জানি, সালমান শাহ ক্যারাটে জানেন। হিটটা লাগল সালমান শাহর কপালে। তিনি তো খুব ফর্সা ছিলেন। এটা ফুলে নীল হয়ে গেল। সেটা অবশ্য পরে দেখেছিলাম, তিনি ঘুষিটা খেয়ে ঘুরে গিয়ে পড়লেন। এখনও ওনার মতো রিয়্যাকশন বাংলাদেশের কোনো নায়ক দিতে পারবে না। মানে ভিলেন মারলে কী রিয়্যাকশন দিতে হয়, এটা ওনার মত কেউ পারেন না। তারপর দেখি সালমান শাহর খুব বাজে অবস্থা। কপাল ফুলে নীল হয়ে ঢোল হয়ে গেছে। ভেতরে ভেতরে আমার তো অবস্থা খারাপ। সালমান শাহর মতো সুপারস্টারকে মারলাম! বাট ওই অবস্থায় সালমান শাহ এসে বললেন, মিশা ভাইয়ের দোষ নাই। আরমান ভাই আমাকে সেভ করো।’

এই ঘটনায় দুই দিন শুটিং বন্ধ ছিল। এখানে একটা কথা বলি, এত বড় দুর্ঘটনা হবে আমি ভাবিওনি। এই ছবিতে সালমান শাহ অভিনয় করবে জেনে আমার যে কী প্রস্তুতি ছিল! শুধু আমার সংলাপ নয়, পুরো ছবির সংলাপ মুখস্থ করেছিলাম। মুখস্থ আছে এখনও। এই শিল্পী যদি আমাদের মাঝে আরও কিছুদিন থাকতেন, তাহলে চলচ্চিত্রটা আরও উপরে থাকত। আজকে যদি মান্না থাকতেন, আর যদি সালমান থাকতেন, আজকে দিলদার ভাই থাকতেন, ফরীদি, রাজীব থাকতেন আমরা অন্য লেভেলে চলে যেতাম। সত্যি বলতে আমাদের রিকভারিটা হয়নি, শিল্প হয়নি। সালমান শাহ হয়নি।’’

অনুলিখন: ওয়ালিউল বিশ্বাস