মহান বিজয় দিবসে (১৬ ডিসেম্বর) সারাদেশ যখন গৌরবোজ্জ্বল উদযাপনে মগ্ন, ঠিক তখনই সুদূর ইউরোপ থেকে এল বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের জন্য এক আশাজাগানিয়া খবর। আগামী বছর নেদারল্যান্ডসের ৫৫তম রটারড্যাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে (আইএফএফআর) জায়গা করে নিয়েছে তিন-তিনটি চলচ্চিত্র! এদিন উৎসব কর্তৃপক্ষ তাদের অফিসিয়াল সিলেকশন ঘোষণা করেছে, যেখানে বাংলাদেশের পতাকাবাহী হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের পলিটিক্যাল থ্রিলার ‘মাস্টার’। দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা বিভাগের একটি ‘বিগ স্ক্রিন কম্পিটিশন’-এ লড়বে ছবিটি।
বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ও প্রভাবশালী এ-লিস্টের এই চলচ্চিত্র উৎসব নতুন প্রতিভার খোঁজ এবং ক্যারিয়ার লঞ্চপ্যাড হিসেবে বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। ক্রিস্টোফার নোলান থেকে শুরু করে বং জুন-হোর মতো নির্মাতাদের অনেকেরই আন্তর্জাতিক পরিচিতি গড়ে উঠেছিল এই উৎসবের হাত ধরে। এই বছরের উৎসবে বিশ্বের নানা প্রান্তের সেরা সব সিনেমা প্রদর্শিত হবে, যার মধ্যে অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে থাকছে বাংলাদেশের এই ছবিটি।
রটারড্যামের ‘বিগ স্ক্রিন কম্পিটিশন’ মূলত এমন সব চলচ্চিত্রের জন্য তৈরি, যা একই সাথে শৈল্পিক মান এবং বাণিজ্যিক আবেদন—দুটিই ধারণ করে। অর্থাৎ, এই বিভাগের সিনেমাগুলো শুধু ফেস্টিভ্যাল সার্কিটের জন্য নয়, বরং বড়পর্দায় বা প্রেক্ষাগৃহে সাধারণ দর্শকদের দেখানোর মতোই বিশাল ক্যানভাসে নির্মিত। এই বিভাগে বিজয়ী চলচ্চিত্র পাবে ৩০,০০০ ইউরো (প্রায় ৩৮ লক্ষ টাকা) সমমূল্যের পুরস্কার এবং নেদারল্যান্ডসের প্রেক্ষাগৃহে সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার জন্য সার্বিক সহযোগিতা। আর্টহাউজ ও মূলধারার সিনেমার মধ্যে সেতুবন্ধনকারী এই বিভাগে মাস্টার-এর নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
‘নোনাজলের কাব্য’খ্যাত নির্মাতা রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের দ্বিতীয় সিনেমা মাস্টার এগিয়েছে রাজনীতি, সংঘাত ও মানবিকতার গল্পে। ১২২ মিনিট দৈর্ঘ্যের এই ছবির কেন্দ্রে রয়েছে জহির নামের আদর্শবান একজন শিক্ষক। স্কুল, পরিবার আর নিজের আদর্শ নিয়ে বাঁচতে চাওয়া জহির পরিস্থিতির চাপে একসময় উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার পর তার জীবনে শুরু হয় নানামুখী ঘাত-প্রতিঘাত। জনমানুষের প্রত্যাশা, অন্যায্য আবদার এবং নিজের বিবেকের দ্বন্দ্বে জহির কি তার আদর্শ ধরে রাখতে পারেন, নাকি বদলে যান অন্য এক মানুষে—তাই উঠে এসেছে এই সিনেমায়।
মাস্টার-এর প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাসির উদ্দিন খান। এছাড়াও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন আজমেরী হক বাঁধন, জাকিয়া বারী মম, ফজলুর রহমান বাবু, শরীফ সিরাজ, তাসনোভা তামান্না, আমিনুর রহমান মুকুল ও মাহমুদ আলম। চিত্রগ্রহণে ছিলেন তুহিন তামিজুল এবং প্রডাকশন ডিজাইনে ভারতের জোনাকি ভট্টাচার্য।
যেহেতু মাস্টার বড়পর্দার কথা মাথায় রেখেই নির্মিত, তাই এর কারিগরি দিকগুলোতে দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব। ছবির পরিচালক সুমিত, যিনি একসময় নিউইয়র্কে শব্দগ্রাহক ও সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন, তিনি এই সিনেমার টেকনিক্যাল মানের ক্ষেত্রে কোনো আপস করেননি।
সিনেমাটির সম্পাদনা করেছেন অস্কার মনোনয়নপ্রাপ্ত ছবির (জুডাস অ্যান্ড দ্য ব্ল্যাক মেসায়া) সম্পাদক এবং একাডেমি মেম্বার ক্রিস্টান স্প্রাগ। সংগীত পরিচালনা করেছেন লস এঞ্জেলেসে কর্মরত তাইওয়ানিজ কম্পোজার হাও টিং শি, যিনি দেশি ও বিদেশি সুরের সংমিশ্রণে ছবির আবহে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন।
এছাড়াও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ছবিটির কালার গ্রেডিং, সাউন্ড ডিজাইন ও মিক্সিং সম্পন্ন হয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল ও বুসান শহরের বিশ্বমানের স্টুডিওতে (সি৪৭, ওয়েবল্যাব ও বুসান সাউন্ড স্টেজ)। কোরিয়ান সিনেমার সম্পাদক স্টিভ এম. চো (বং জুন-হোর ‘স্নোপিয়ার্সার’) এবং শব্দ ডিজাইনার হান ম’হুয়ানের (‘বার্নিং’) তত্ত্বাবধানে কাজ করেছেন বাংলাদেশের শব্দ সম্পাদক শৈব তালুকদার ও পরিচালক সুমিত।
বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় চলচ্চিত্র অনুদানপ্রাপ্ত এই ছবি প্রযোজনা করেছে ‘মাইপিক্সেলস্টোরি’। প্রতিষ্ঠানটি এর আগে বহুল প্রশংসিত নোনাজলের কাব্য (শ্রেষ্ঠ ছবি, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার) উপহার দিয়েছিল।
চলচ্চিত্র-বোদ্ধাদের মতে, রটারড্যামের মতো একটি স্বনামধন্য উৎসবে বাংলাদেশের স্থানীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে নির্মিত একটি ছবির এই অর্জন নিঃসন্দেহে বাংলা চলচ্চিত্রের বিশ্বযাত্রায় একটি নতুন পালক।
প্রসঙ্গত, রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের ‘মাস্টার’ ছাড়াও নেদারল্যান্ডসের রটারড্যাম উৎসবে অংশ নেবে মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম পরিচালিত সিনেমা ‘দেলুপি’ ও মেজবাউর রহমান সুমনের ‘রইদ’। উৎসবে তিনটি ভিন্ন প্রতিযোগিতা বিভাগে লড়বে বাংলাদেশের এই তিন চলচ্চিত্র।