চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতি কুড়িয়েছেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হলে তিনি সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। আজ এই সাবেক উপদেষ্টা-নির্মাতার জন্মদিন। জীবন-বসন্তে ৫৩ বছরে পা রাখলেন। বিশেষ এই দিনে সামাজিকমাধ্যমে জন্মদিন উদযাপনের মুহূর্ত শেয়ার করার পাশাপাশি নিজের জীবন ও ক্যারিয়ার নিয়েও কলম ধরলেন তিনি।
শনিবার (২ মে) দুপুরে সামাজিকমাধ্যম ফেসবুকে ‘আধা-বিপ্লবী, আধা-আপোষী এক জীবন’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ পোস্ট দেন ফারুকী। তিনি লেখেন, ‘জন্মদিন আসলে রিফ্লেক্ট (অনুধাবন) করার অবকাশ তৈরি হয়। জীবনের একটা বড় অংশই কাটায়া ফেলছি। পেছন ফিরে তাকালে কত কিছু সিনেমার মতো ভেসে আসে। মনে হয় লিখে রাখি একটা চিঠি, যদি কেউ পড়ে আজি হতে শতবর্ষ পরে, এই আশায়।’
যোগ করে বলেন, ‘এই জীবনে যখন যেটা ঠিক মনে করছি, সেটা বলছি, করছি। এতে অজনপ্রিয় হবো কিনা ভাবি নাই।’
চলচ্চিত্র নির্মাণ-যাত্রা শুরুর সেই দিনগুলোর কথা উল্লেখ করে ফারুকী বলেন, ‘ক্যারিয়ার শুরুই করছি তখনকার সময়ে প্রায় ব্লাসফেমাস (নিন্দনীয়) কাজ করে। সেটা হলো নিজেদের ভাষায় সংলাপের ব্যবহার করে। সেসময় এটার জন্য প্রায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল স্কেলে নিন্দাবাদ জানায় আমাদের কালাচারাল ইন্ডাস্ট্রির বটবৃক্ষগণ। আমি নিছক দূর্বাঘাস। নিজের বিশ্বাসের রাস্তায় হেঁটে গেছি মাথা নিচু করে।’
ফারুকীর নাটক-চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মাধ্যমে প্রতিভাবান অনেকে অভিনয় দুনিয়ায় আত্মপ্রকাশ করেছেন। নির্মাতার ভাষ্য, ‘‘অভিনেতা বাছাই বা অভিনয়ের ঢংয়ে আমার নিজের চিন্তা যুক্ত করার চেষ্টা করছি। বিশাল একটা এস্টাবলিশমেন্ট (প্রচলিত ব্যবস্থা) ওটা নিয়েও আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে বলেছিল ‘অভিনয় জিনিসটাকে শেষ করে দিচ্ছে ফারুকী’। খুব বাজে আক্রমণ করা হইছিলো। তারেক মাসুদ সেই দুর্দিনে পাশে দাঁড়ান।’’
তিনি বলেন, ‘‘বোরখার অধিকারের পক্ষে বলছি, আবার জিন্স, টি-শার্টের অধিকারের পক্ষেও বলছি। বৈশাখী শোভাযাত্রার পক্ষেও বলছি, ঈদ মিছিলের পক্ষেও থাকছি। শাহবাগের কালে যখন বলা হলো ‘কিন্তু এবং যদি বলা যাবে না’, তখন লিখছিলাম ‘কিন্তু এবং যদির খোঁজে’। নো ভ্যাট, নিরাপদ সড়ক, আঠারোর কোটা আন্দোলন—সবসময়ই সরব থাকার চেষ্টা করছি এই আশায় যে মুক্তি হয়তো নিকটেই। অভিজিতের হত্যাকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়ে লিখেছি, আবার শাপলা হত্যাকাণ্ডেও একইভাবে ক্ষুব্ধ হয়ে লিখেছি।’’
তবে ফারুকীর ভাষ্য, ‘সবসময় যা যা বলার দরকার ছিল, তা তা যে বলতে পারছি—সেটা না; বা জীবনের সব সিদ্ধান্তই যে ঠিক নিছি তা-ও তো না। জীবন তো ভুলেরই পাঠশালা।’
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে রক্তক্ষয়ী এক অধ্যায় জুলাই গণঅভ্যুত্থান, যার মাধ্যমে শেখ হাসিনার দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। উত্তাল সেই পরিস্থিতিতে ছাত্র-জনতার পক্ষে ছিল ফারুকীর অবস্থান। তিনি বলেন, ‘এর মাঝে আসে জুলাই। আমার বয়েসীদের জীবনে এতো বড় ঘটনাতো আর আসে নাই। এর তো একটা অভিঘাত আছে। শিল্পী হিসেবে আমি অতোটা অভিজাত হইতে তো পারি নাই, যে পাখির মতো গুলি করে ছোট-ছোট বাচ্চাদের মেরে ফেলা হবে আর আমি এটা উপেক্ষা করে গাইতে পারবো রাগ মালকোষ। আমি তো আমার গুম হওয়া বন্ধুদের সন্তানদের কান্না উপেক্ষা করতে শিখি নাই।’
যোগ করে বলেন, ‘‘জুলাইয়ের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে অনেক বন্ধু হারাইছি। আবার বন্ধুযোগও অনেক। হারানো বন্ধুদের জন্য একটা কথাই বলার আছে—সময়ের প্রয়োজনে প্রেমিকেরা হাসিমুখে বুক পেতে দিয়ে বলে, ‘বুক পেতেছি গুলি কর’। আমি তো তাদের মতো সাহসী হইতে পারি নাই, তবে তাদের জয়গান আমার অক্ষম কণ্ঠে ধারণ করার চেষ্টা করছি। স্রেফ এইটুকুই।’’
একটি গল্পের অবতারণা করে হতাশার সুরে এই নির্মাতা বলেন, ‘‘আমার এক সুহৃদ বললো, ‘ভাই, আপনার এই ঝুঁকি নেয়া ঠিক হয় নাই। সেদিন ‘অমুক’ পত্রিকায় বাংলাদেশের সিনেমা নিয়ে লিখছে। জহির রায়হান থেকে শুরু করে সানি সানোয়ার পর্যন্ত সবাই আছে, আপনি নাই।’ আমি বললাম, ‘আলহামদুলিল্লাহ’। ঐ সুহৃদ আবার একটা খুব মজার কথা বললো। ‘আপনি খেয়াল করছেন আপনার জন্মদিনে কালচারাল ইন্ডাস্ট্রির সবাই আগে লিখতো, পত্রিকায় লিখতো। এখন আর দেখেন সেটা?’ আমি বেশ মজা পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কেনো, আমি জুলাইয়ের পক্ষে ছিলাম, এই জন্য লিখে না?’ ‘সেটা একটা কারণ হতে পারে। তবে মিডিয়াপাড়া এটা বন্ধ করছে কয়েকবছর আগে নিকেতনের এক অফিসে আড্ডার পর। সেখানে একজন সতর্ক করেছে যে মে মাসের ২ তারিখে জন্মদিন পালনের মধ্যদিয়ে সত্যজিতের মুখোমুখি দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে ফারুকীকে। এটা বন্ধ করতে হবে!’ আমি হাসতে হাসতে মারা গেলাম। হলি মলি!’’
ফারুকী বলেন, ‘আমাদের জীবন কয়টা দশক মাত্র। আমরা সবাই তাঁর তাঁর মতো করে মিনিংফুল (অর্থপূর্ণ) জীবন যাপন করতে চাই। বাকিটা জানে আলেক সাঁই।’
পোস্টের শেষদিকে মেয়ে ইলহামের জন্য সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি স্ত্রী অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার কাছেও। নির্মাতা লেখেন, ‘জীবনের সবচেয়ে লম্বা পথের সঙ্গী তিশার প্রতি কৃতজ্ঞতা আলো হয়ে পাশে থাকার জন্য। ইলহামের জন্য আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা। আমার মা-বাবা-পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা। আমার বন্ধু-বান্ধব, ভাই-ব্রাদার-বোন-সিস্টারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। আমার দর্শকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা। আমার সিনেমাগুলা আসলে আমার দর্শকের সাথে আমার কনভারসেশন। এই কনভারসেশন চলতেই থাকুক। একসময় যখন আমরা এই দুনিয়ায় থাকবো না, তখনও নিশ্চয়ই এই কনভারসেশন চলবে অন্যমাত্রায়।’
প্রসঙ্গত, সবশেষ ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মুক্তি পায় মোস্তফা সরয়ার ফারুকী পরিচালিত সিরিজ ‘৮৪০’। রাজনৈতিক বিদ্রূপধর্মী এই সিরিজে মুখ্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাসির উদ্দিন খান।