অস্কারে আলোচিত

যে মস্তিষ্ক শিশুর, জীবনটা মনস্টারের

সিনেমাটির দৃশ্যে এমা স্টোন। ছবি: সংগৃহীত

‘কবিতার দিকে আমরা এগোই অনুভূতি দিয়ে, আর সিনেমার দিকে ভাবনা দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে। ভালো কবিতা বর্ণনা করার কথা ভাবে না, কিন্তু ভালো সিনেমার ক্ষেত্রে বন্ধুকে ফোনে তার গল্প না করলে কী আর হলো!’—কথাগুলো এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন ইরানের কিংবদন্তি নির্মাতা আব্বাস কিয়ারোস্তামি। হঠাৎ তাঁর এই কথাগুলো মনে পড়ল, কারণ এমন একটি সিনেমার গল্পই এখন বলতে যাচ্ছি। সেটা গ্রিক নির্মাতা ইয়োর্গস লান্থিমোসের ‘পুওর থিংস’। এবারের ৯৬তম অস্কারে যা সেরা সিনেমা, সেরা অভিনেত্রীসহ ১১টি শাখায় মনোনয়ন পেয়েছে।

গল্পটা একটু ভিন্ন ধরনের। সিনেমাটিতে প্যারালাল ইউনিভার্সকে তুলে ধরেছেন নির্মাতা। যেখানে অন্তঃসত্ত্বা এক তরুণী ব্রিজ থেকে লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে, পরে আবারও পুনর্জীবন লাভ করে। কীভাবে? আসলে ছবিটি বাস্তব আর পরাবাস্তবতার মিশেল। কখনো কখনো তা মিলেমিশে একাকারও হয়ে যায়। আত্মহত্যার পর ওই তরুণীর খোঁজ পান শরীরতত্ত্ববিদ ডা. গডউইন বাক্সটার। সেটা এক মনস্টারদের পৃথিবী। চলচ্চিত্রে চরিত্রটি অনেকটা মেরি শেলির ‘ফ্রাংকেনস্টাইন’ উপন্যাসের সেই তরুণ বিজ্ঞানীর মতো, যার কিনা নানা ধরনের প্রাণী সৃষ্টির অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে। এখানে ডা. গডউইন তরুণ নয়, বয়সে প্রবীণ। তারই সৃষ্টি বেলা বাক্সটার। আর এই তরুণীকে ঘিরেই এগিয়ে চলে পুওর থিংসের কাহিনি। আত্মহত্যার পর মেয়েটির মস্তিষ্কে গর্ভে থাকা শিশুর মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপন (ব্রেন ট্রান্সপ্ল্যান্ট) করে দেওয়া হয়।

বেলা নিজেও মনস্টার, কিছু অনুভূতি মানুষের মতো; আবার ঠিক মানুষও না। স্বভাবে শিশুসুলভ। একদিন হঠাৎ হস্তমৈথুনের মতো সুখের আবিষ্কার করে। যৌনতার নতুন এক ভুবন তাকে হাতছানি দেয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায়, তরুণীটি সেক্সুয়াল হিস্টেরিয়াগ্রস্ত। যে আসক্তি চরিত্রটিকে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার দিকে টেনে নেয়। একপর্যায়ে ডাক্তারের সহযোগী তরুণ ম্যাক্স ম্যাকক্যান্ডলসের সঙ্গে বাগদান হয় বেলার। কিন্তু যৌনতার ফাঁদে পড়ে ডানকান ওয়েডারবার্নের হাত ধরে পৃথিবীর পথে বেরিয়ে পড়ে সে। গল্পটি তখন ভিক্টোরীয় যুগের লন্ডন হতে লিসবন, আলেকজান্দ্রিয়া, প্যারিসের মতো নানা শহরে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

একটি দৃশ্যে এমা স্টোন ও মার্ক রাফালো। ছবি: আইএমডিবি থেকে নেওয়া

সিনেমাটির বেলা চরিত্রটি ‌‘স্বাধীন সত্তা’র প্রতীক। দিনশেষে যা ব্যক্তি স্বাধীনতার দিকে ইঙ্গিত দেয়। এই চরিত্রে অবিশ্বাস্য অভিনয় করেছেন এমা স্টোন। ভ্যারাইটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী বলেন, ‘জীবন ও মানবতার স্বার্থে বেলা যেভাবে ভালো-মন্দ, কুৎসিত-সুন্দর গ্রহণ করে নেয়, তা চিত্তাকর্ষক, আমার কাছে তা খুব অনুপ্রেরণাদায়ক ছিল।’

সত্যিই তাই! বেলার এই অ্যাডভেঞ্চার শুধু যৌনতারই নয়। পাশাপাশি সে জীবনের ধাপে ধাপে অনেক কিছুরই অভিজ্ঞতা লাভ করে। এই পৃথিবীর বিভিন্ন বাস্তবতা ফুটিয়ে তোলে। প্যারিসে থাকাকালে বেলা আর ওয়েডারবার্নের পরিস্থিতি আপনাকে মনে করিয়ে দিবে—‘দুনিয়া ঘুরে টাকার চাকায়’। প্রাচুর্য থেকে অভাবের এক দুনিয়ায় থামতে হয় তাকে। কাজ হিসেবে বেছে নিতে হয় পতিতাবৃত্তি। যদিও সে জানে না ‘পতিতা’ কী!

ডা. গডউইনের ভূমিকায় উইলিয়াম ড্যাফো। ছবি: আইএমডিবি থেকে নেওয়া

শুধু তা-ই নয়, এই সিনেমায় নির্মাতা দর্শন ও সমাজতন্ত্রের দিকেও আলো ফেলেছেন। বেশ কিছু সংলাপে অবাক হয়ে ভাবতে হয়। যেগুলোতে রয়েছে ব্ল্যাক কমেডির ছোঁয়া। যেমন বেলা জ্ঞান অর্জনের জন্য দর্শন পড়তে শুরু করলে, এক যুবক তাকে বলে—‘ফিলোসফি স্টাডি ইজ দ্য ওয়াস্ট অব টাইম’ (দর্শনচর্চা মানেই সময়ের অপচয়)। তখন আরেক বর্ষীয়ান নারী বেলাকে আরও বই দিতে থাকে এবং পড়তে অনুপ্রেরণা দেয়। আবার আরেকটি সংলাপ রয়েছে—‘উই আর অল মাস্টার্স অব আওয়ার ওউন শিপ’ (মানুষ নিজেই তার ভালো-মন্দের ভাগ্য নির্ধারক)। এমন নানা নীতিবাদ ও কৌতূকপূর্ণ সংলাপ রয়েছে সিনেমাজুড়ে। স্কটিশ লেখক ও ভিজ্যুয়াল আর্টিস্ট আলাসদাইর গ্রের একই নামের একটি উপন্যাস অবলম্বনে লান্থিমোস নির্মাণ করেছেন পুওর থিংস। চিত্রনাট্য লিখেছেন টনি ম্যাকনামারা।

এতে অভিনেতা উইলিয়াম ড্যাফো রয়েছেন ডা. গডউইন চরিত্রে। ডানকান ওয়েডারবার্নের ভূমিকায় রয়েছেন মার্ক রাফালো। ম্যাক্স ম্যাকক্যান্ডলসের ভূমিকায় আছেন রামি ইউসুফ। প্রত্যেকেই অভিনয়ে বেশ সাবলীল, একেবারে যথাযথ বাছাই বলা যায়। তবে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে গেলে, এমা স্টোনের পারফরম্যান্স এ সিনেমায় অবাক করার মতো। এবারের অস্কারে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কারটি তাঁর ঝুলিতে ওঠার সম্ভাবনা তাই প্রবল।
     

অন্যদিকে, সিনেমাটির শুরু থেকেই আর্ট ডিজাইন আর কস্টিউমে রয়েছে শৈল্পিকতার প্রতিফলন। ভিক্টোরীয় যুগের দালান-কোঠা আর প্রাচুর্যতার নৈপুণ্য চোখে পড়ে। সিনেমাটোগ্রাফিতেও। রবি রায়ান দারুণ দারুণ ফ্রেমের চমক দেখিয়েছেন। জারস্কিন ফেনড্রিক্সের আবহ সংগীতও দৃশ্যের সঙ্গে মানানসই। তবে কোনো কোনো দর্শকের কাছে এই ছবি দেখায় বিরক্তির কারণ হতে পারে একটু পরপর থাকা যৌনদৃশ্যের কারণে। এ ছাড়া বেলা চরিত্রটি দর্শককে ফরাসি নির্মাতা জুলিয়া দুকুরনোর ‘তিতান’ ছবির কথাও মনে করিয়ে দিতে পারে। মনঃস্তাত্ত্বিক সেই চলচ্চিত্রটি ৭৪তম কান চলচ্চিত্র উৎসবে স্বর্ণপাম জিতেছিল।

রেটিং: ৪.৬/৫

পরিচালক: ইয়োর্গস লান্থিমোস
গল্প: পুওর থিংস/আলাসদাইর গ্রে
চিত্রনাট্য: টনি ম্যাকনামারা
অভিনয়শিল্পী: এমা স্টোন, উইলিয়াম ড্যাফো, মার্ক রাফালো, রামি ইউসুফ প্রমুখ
ভাষা: ইংরেজি
ধরন: রোমান্স, কমেডি, ড্রামা, সাইফাই
মুক্তি: ৮ ডিসেম্বর ২০২৩