একটা সময়ে মেয়ে শিশুদের হাতের জনপ্রিয় খেলনা হিসেবে পরিচিত ছিল বার্বি ডল। অপূর্ব সুন্দর এই পুতুলটিকে সিনেমার চরিত্রে রূপদান করেছেন নির্মাতা গ্রেটা গারউইক। অনেক বাঘা বাঘা নির্মাতাকে পেছনে ফেলে অস্কার মনোনয়নে স্থান করে নিয়ে মুক্তির প্রায় ৭ মাস পরে আবারও আলোচনায় ‘বার্বি’। আগামী ১০ মার্চ ‘ওপেনহাইমার’, ‘কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন’, ‘পুওর থিংস’-এর মতো চলচ্চিত্রগুলোর সাথে অস্কারের মঞ্চে প্রতিযোগিতা করবে সিনেমাটি।
বার্বি কি শুধুই গোলাপি দুনিয়ার হাতছানি? নাকি নারীবাদী আন্দোলনের পালেও হাওয়া দেয় ছবিটি? কেমনইবা তার নির্মাণশৈলী? এসব প্রশ্নের উত্তরই এবার খোঁজা যাক।
ওয়ার্নার ব্রাদার্স প্রতিষ্ঠানের প্রযোজনায় ‘বার্বি’ নির্মাণ করেছেন গ্রেটা গারউইক। চলচ্চিত্রের দুনিয়ায় অন্যতম নারী নির্মাতা তিনি। তাঁর নির্মিত সিনেমার মধ্যে রয়েছে ‘লিটল উইম্যান’, ‘লেডি বার্ড’, ‘হোয়াইট নয়েজ’-এর মতো সিনেমা। প্রতিবারই তিনি দর্শককে দিয়েছেন আনকোরা নতুন গল্প। বার্বি তার ব্যতিক্রম নয়।
বার্বি ও কেনের নতুন এক দুনিয়া তৈরি করেছেন পরিচালক সিনেমার সেটে। ফিকশনাল এই আয়োজনে কোথাও নেই অবিশ্বাস করার সুযোগ। বার্বির দিনযাপন, কেন-এর পারফেকশন—সব মিলিয়ে প্লাস্টিকের সেই দুনিয়াতে তৈরি হয় এক কল্পনার জগত। এটিই হয়ে উঠেছে সিনেমার বার্বি ওয়ার্ল্ড। গোলাপি সেই বার্বি ওয়ার্ল্ডের মতোই সিনেমার প্রচারণাতেও লক্ষ্য করা গিয়েছিল পিংক ফ্যাশনের প্রভাব। গোলাপি ফ্যাশনেবল কাপড়ে বার্বির প্রচারণায় নেমেছিলেন সারা পৃথিবীর অনেক তারকা ও মডেলরা।
লাইট... ক্যামেরা... অ্যাকশন
সিনেমার সংলাপে আমরা উঠে আসতে দেখি পুরুষের তৈরি করা দুনিয়াতে ঠিক কতখানি কপট উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে যেতে হয় নারীকে। আমেরিকা ফেররেরার আইকনিক মনোলগ তুলে আনে সেই চিত্রই। এই মনোলগে আমরা দেখি কোনো একটি অর্জন কখনোই যথেষ্ট নয় নারীর জন্য। যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়ে যায় তা হলো—মানুষের দুনিয়াতে কেন এত বৈষম্য, যা নেই বার্বি ওয়ার্ল্ডে?
বার্বি ল্যান্ডের বার্বি পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর পুতুল। একদম নিখুঁত যাকে বলা যায়। বার্বির দুনিয়ায় নেই দুঃখ–কষ্ট। সেখানে সবই চলে বার্বি ল্যান্ডের নিয়মে। যেখানে নেই কোনো পুরুষতান্ত্রিক আচরণ। এমন একটি দুনিয়া মেয়েদের জন্য ইউটোপিয়াই বলা যায়। তাই বার্বি যখন পৃথিবীর মাটিতে পা রাখে, তখন যেন নারী অধিকার নিয়ে গর্ব করা বর্তমান পুরুষতন্ত্রকে চোখে আঙুল দিয়েই বুঝিয়ে দেয় যে, নারী স্বাধীনতা এখনও স্বপ্নই। আর যে তথাকথিত স্বাধীনতা আছে, সেটাও পুরুষতন্ত্র অক্ষত রেখেই তৈরি করা।
বার্বি সিনেমার চিত্রনাট্য একদমই সহজ–সরল। সিনেমার শুরুটাও হয় খুব সহজভাবেই। প্লাস্টিকের পুতুলের দুনিয়ার বার্বি ও কেনরা সকল জরার ঊর্ধ্বে। ঘটনার প্রবাহে যখন বার্বি ও কেন সত্যিকার পৃথিবীতে পৌঁছায়, তখনই ঘটে বিপত্তি। বার্বির সহজ-সরল সেই দুনিয়াকে সামনে রেখে বাস্তব দুনিয়ার তথাকথিত নিয়মকেই প্রশ্ন করেছেন নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার। একইসাথে সংলাপও ছিল বুদ্ধিদীপ্ত ও ভাবনার উদ্রেককারী। কমেডির অস্ত্রে পুরুষতন্ত্রকে প্রশ্ন করে যান নির্মাতা। তাই বলাই যায়, বার্বি সিনেমাটি কিছুটা হলেও নারীবাদী আন্দোলনের পালে হাওয়া তো দিয়েছেই।
বার্বির প্রোডাকশন ডিজাইন নিয়ে এবার কথা বলতে চাই। রং বিন্যাস থেকে পোশাক ডিজাইন, আলোকসজ্জা থেকে চিত্রগ্রহণ সব কিছুতেই মুনশিয়ানার ছাপ রেখেছে প্রোডাকশন টিম। এরই মধ্যে অস্কারে প্রোডাকশন ডিজাইন বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছে সিনেমাটি। প্রোডাকশন ডিজাইনার সারাহ গ্রিনউড ও সেট ডেকোরেটর কেটি স্পেন্সার গত শতকের নব্বই দশকের বার্বি বক্সের আদলে বাচ্চাদের ফ্যান্টাসি ওয়ার্ল্ডের বাস্তব রূপ দিয়েছেন। পোশাকের আয়োজন ছিল নজরকাড়া।
সিনেমাটোগ্রাফির ডিজাইন ছিল খুবই সরলরৈখিক। মনে হয়েছে, আরও কিছু হয়তো করা যেত! রদ্রিগো প্রিয়েতো ছিলেন ছবির ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফি, যাঁর ঝুলিতে আছে দ্য আইরিশম্যান, আমোরে পেরোস, কিলারস অব দ্য ফ্লাওয়ার মুন’র মতো সিনেমাগুলো। ফলে বার্বির চিত্রগ্রহণ নিয়ে আশা ছিল অনেক। কিন্তু সেই আশা পূরণ হয়নি ছবিটিতে।
১৯০ জন অভিনেতা-অভিনেত্রীর এই সিনেমাটিতে সকলেই দুর্দান্ত নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। বার্বি ও কেন চরিত্রে যথাক্রমে মার্গো রবি ও রায়ান গসলিং—দুজনেই ছিলেন অসাধারণ। যদিও অস্কারের মনোনয়ন তালিকায় নেই কারোরই নাম!
পুরোপুরি বাণিজ্যিক ঘরানার সিনেমার আবশ্যিক উপাদানগুলো ভালো মতোই উপস্থিত বার্বিতে। আর সেটা যে কতখানি, তা বক্স অফসে নজর রাখলেই বোঝা যায়। এখন পর্যন্ত প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করেছে সিনেমাটি। সোশ্যাল মিডিয়া, ফ্যাশন জগতসহ সব জায়গায় একক আধিপত্য বজায় রেখেছিল বার্বি। বলা যায়, দর্শকদের মনোরঞ্জন করতে বেশ সফল সিনেমাটি। এটি নারী মুক্তির ভাবনার পালে হাওয়া দিয়েছে ঠিকই, তবে ওই হাওয়ায় নৌকা কতদূর যাবে—সেই প্রশ্ন কিন্তু থেকেই যায়। সিনেমায় অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান দিনশেষে কেবল মুনাফার খোঁজই যে করে। আর মুনাফাই যেখানে প্রথম ও শেষ কথা, সেখানে প্রকৃত মুক্তির গান আশা করা বৃথা!