তিনজনের গল্প যখন কবিতা হয়ে যায়

জয়দীপ, শেফালি ও স্বানন্দ। ছবি: নেটফ্লিক্স

আচ্ছা, কখনও কি মনে হয় জীবনের অতীত সময়টা অন্য কোনো জন্মের? মানে এতটাই দূরের, যেন অন্য কোনো দুনিয়ার অন্য কোনো বাস্তবতার?

হতেই কিন্তু পারে। কেবলই বর্তমানের তুমুল ব্যস্ততায় জীবনকে কোনোভাবে কাটিয়ে নেওয়ার যুদ্ধ করতে করতে যখন হুট করে আপনার মনে পড়বে বহু বছর আগে স্কুলের সেই ছোট্ট কোণায় মানুষের ছায়া দেখে ভূতের ভয় পাওয়ার কথা, তখন অতীত ও বর্তমানের এই আসা-যাওয়াকে ইন্টারস্টেলার ট্রাভেলের সঙ্গে আপনি তুলনা করতেই পারেন। কাটিয়ে আসা সেই সময়কে মনে করে হয়তো বোধ হতে পারে যে, সেটি আসলে কারও কাছে শোনা রূপকথার গল্প!

ঠিক এমন এক ধরনের ভ্রমণের গল্প হলো ‘থ্রি অব আস’। ভারতে প্রেক্ষাগৃহের পর কিছুদিন আগে এটি স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সেও মুক্তি পেয়েছে। মুক্তির পর থেকেই প্রশংসা পাচ্ছে ছবিটি। কানমুখে ছবিটির ব্যাপারে শুনে এবং বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটা ছোট্ট সংলাপ দেখে চোখ আগ্রহী হয়ে ওঠে ৯৯ মিনিট অক্লান্ত থাকার জন্য। স্ক্রিনে প্রথম ২৫ মিনিট কাটানোর পরই অবশ্য বোঝা হয়ে যায়, চোখের অত্যাচার হচ্ছে না।

শৈলজা চরিত্রে শেফালি। ছবি: নেটফ্লিক্স

সিনেমার শুরুটা হয় শৈলজা দেসাইকে দিয়ে। শেফালি শাহ অভিনীত এই চরিত্রটিই ছবির তিন চরিত্রের প্রধানতম। একেবারেই দৈনন্দিন জীবনের ছোটখাটো ঘটনা দিয়ে এগিয়ে যায় সিনেমার গল্প। বিয়ে নামক গিঁটে বাঁধা দুটি মানুষ যদি বিচ্ছেদের দিকে যেতে চায়, তখনই কাজ আরম্ভ হয় শৈলজার। কখনও কখনও হয়তো এই বিচ্ছেদকে আইনের বাঁধনে বেঁধে কিছুটা বিলম্বিত করার চেষ্টা করে শৈলজা। কারণ বিচ্ছেদ দিয়ে জীবিকা নির্বাহ হলেও শৈলজা নিজে যে বাঁধনে আটকে থাকাদেরই দলে।

গল্পের স্বাভাবিক প্রবাহমানতা ধীরে ধীরে দর্শকদের জানায় শৈলজার ডিমেনশিয়ায় ভোগার কথা। বিষয়টিতে কোনো আরোপিত নাটকীয়তা ছিল না। বরং এমনভাবে একে উপস্থাপন করা হয়, যেন এটি মধ্যবিত্তের নিত্যকার রুটিনেরই একটি অংশ। আসলেই কি বিষয়টি তেমন নয়? ভারতীয় উপমহাদেশের দেশগুলোতে যে মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে উঠেছে, সেটি প্রায় সময়ই এমন টলমল পরিস্থিতিতে থাকে যে, চরম সংকট সেখানে মাঝে মাঝে কেবলই একটি ‘অবস্থা’ হয়ে আসে। ওই অবস্থা নিয়ে পরিবারগুলো বিষণ্ণ থাকে বটে, কিন্তু করার তেমন কিছু না থাকায় মেনে নেওয়াই একমাত্র বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। ছবিতে শৈলজার স্বামী দীপংকর দেসাইও তাই কিছুটা মেনে নেওয়ার মানসিকতা নিয়েই এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। শৈলজাও তাই। কেবল হুট করেই তার নিজের অতীতকে আরেকবার ছুঁয়ে দেখার সাধ জাগে। কারণ চিকিৎসকেরা যে বলে দিয়েছেন, একসময় সব অতীতই ভুলে যেতে পারে সে। স্লেটকে ক্লিন হতে দেওয়া ঠেকানোর যেহেতু কোনো পথ নেই শৈলজার সামনে, তাই স্মৃতিকে আরেকবার ঝালাই করে কাতর হওয়ার বা সেই স্মৃতির স্থায়িত্ব আরেকটু বাড়ানোর আশা সৃষ্টি কি বাড়াবাড়ি কিছু?

দীপংকর ও শৈলজা। ছবি: নেটফ্লিক্স

হ্যাঁ, তা নয় একেবারেই। তাই দীপংকর একেবারেই বাধা দেয় না, বরং উল্টো শৈলজার সাথী হয়। আর এর পরেই শুরু হয় সেই অবিস্মরণীয় যাত্রা। এতে বিরতি কম। বরং এ ভ্রমণ অনেকটা পাড়ার গলিতে নির্ভার মনে হাঁটতে হাঁটতে শৈশব-কৈশোরের সব চরিত্রের সঙ্গে একে একে রিইউনিয়ন হওয়ার মতো। তেমনটা শৈলজারও হয়। বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে সঙ্গে দেখা হয় জীবনের সাবেক প্রেমিকের সঙ্গেও। সে–ই এই সিনেমার তৃতীয় জন। অন্তত দৃশ্যের উপস্থিতির দিক থেকে তেমনটাই ধরা যায়। শুধু বন্ধু বা প্রেমিক নয়, এমনকি শৈশব থেকে শুরু হওয়া ট্রমাও সাক্ষাৎপ্রার্থীর তালিকা থেকে বাদ যায় না। এভাবেই জীবনের সব স্মৃতিকে একবার করে ছুঁয়ে যায় শৈলজা। হয়তো শেষবারের মতোই।

‘থ্রি অব আস’-এর স্টোরি টেলিং খানিকটা বহতা নদীর মতো। ছোট্ট ছোট্ট ঢেউয়ে বয়ে যায় গল্প। কিছুটা ধীর লয়ের, কিন্তু কখনোই তা বিরক্তির জন্ম দেয় না। হ্যাঁ, এখনকার থ্রিলার বা মিস্ট্রি জঁরার উত্তাল জোয়ারের মধ্যে এই ছবিটি একেবারেই বেমানান। অ্যাড্রেনালিন রাশ নেই, নেই ‘কী হয়, কী হয়’ আবহ। কিন্তু পুরো ছবিটি দেখতে দেখতে এক লহমায় নিজের স্মৃতিগুলোর সঙ্গে হালকা আলাপ হয়ে যায় ঠিকই। হয় কুশল জিজ্ঞাসাও। সবচেয়ে বড় যে পাওয়া হয়, সেটি হলো চোখ ও মনের শান্তি।

এই ছবির পরিচালক অবিনাশ অরুণ। এর আগে ‘পাতাললোক’ নামের সিরিজ বানিয়ে নাম কুড়িয়েছিলেন তিনি। সেই ধারা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে গেছেন তিনি ‘থ্রি আব আস’-এ। অবিনাশ গুণী সিনেম্যাটোগ্রাফার। সেই গুণের স্বাক্ষর তিনি এই ছবিতেও রেখেছেন। সব মিলিয়ে পরিচালনার দিক থেকে বিন্দুমাত্র খুঁত পাওয়া যায়নি ছবিটিতে।

জয়দীপ। ছবি: নেটফ্লিক্স

আর অভিনয়ের কথা না বললেই নয়। শৈলজা চরিত্রে শেফালি শাহ, দীপংকর হিসেবে স্বানন্দ কিরকিরে ও প্রদীপ চরিত্রে জয়দীপ আহলাওয়াত—এই তিনজনই ছিলেন দুর্দান্ত। এতটাই পরিমিত অভিনয় তাঁরা উপহার দিয়েছেন যে, বারবার দেখতে ইচ্ছে হয়। চরিত্রের বিপরীতে এঁদের আসল নামই যে হারিয়ে গিয়েছিল! এতটাই তাঁরা মিশে গিয়েছিলেন চরিত্রের সঙ্গে।

এক কথায়, ‘থ্রি অব আস’ দেখার অনুভূতি কবিতা পড়ার মতো। বর্তমানে জীবনের ক্লিষ্টতায় আমরা সবাই কম-বেশি পিষ্ট। তা থেকে মুখ সরিয়ে বাসার জানালা খুলে এক পশলা বৃষ্টিভেজা বাতাসে শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দেয় ছবিটি। এতটুকু নিশ্চিত করা যায় যে, তাতে ধুলোর চেয়ে অক্সিজেনের পরিমাণই আপনি বেশি পাবেন!


রেটিং: ৪.৫/৫
পরিচালক: অবিনাশ অরুণ
গল্প ও চিত্রনাট্য: ওমকার অচ্যুত বারভে, অবিনাশ অরুণ ও অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়
সংলাপ: শোয়েব নাজির
অভিনয়শিল্পী: শেফালি শাহ, জয়দীপ আহলাওয়াত, স্বানন্দ কিরকিরে, কাদম্বরী কাদম প্রমুখ
ভাষা: হিন্দি
ধরন: ড্রামা
মুক্তি: ৩ নভেম্বর ২০২৩/ নেটফ্লিক্স