যে সিনেমার ক্লাইম্যাক্স দেখলে আপনি চমকাতে বাধ্য

সিনেমাটির দৃশ্যে পায়েল রাজপুত। ছবি: সংগৃহীত

শুরুতেই ফিরে যাওয়া হয় অতীতে। ১৯৮৬ সালের ঘটনা দিয়ে গল্পের শুরু। কেবলই নিখাদ বাল্যবন্ধুত্ব দেখানোর পরপরই চলে আসে মৃত্যু। সেই সঙ্গে গ্রামের দেয়ালে ফুটে ওঠে আত্মহত্যার দোষ স্বীকার, যেখানে সমাজে প্রচলিত ‘অবৈধ’ সম্পর্ককে কাঠগড়ায় তোলা হয়। গ্রামের সবাই দাঁড়িয়ে দেখছে দেয়ালে লেখা সুইসাইড নোট—সে এক দৃশ্য বটে!

এভাবেই ‘মঙ্গলাভরম’ সিনেমায় ঢোকে দর্শকেরা। এরপর থেকে আর বিশ্রাম নেই চোখের। কারণ ঘটনাক্রম এমনভাবে এঁকে–বেঁকে চলে যে, আপনি চাইলেও তা থেকে সরতে পারবেন না। আর সবশেষে এমন এক ক্লাইম্যাক্স আসে ছবিটিতে যে, আপনি চমকাতে বাধ্য হবেনই!

গত বছরের ২৩ নভেম্বর ভারতজুড়ে সিনেমা হলে মুক্তি পায় ‘মঙ্গলাভরম’। এখন অবশ্য ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ডিজনি প্লাস হটস্টারেও দেখা যাচ্ছে। ছবির পরিচালক অজয় ভূপথি। গল্প লেখার ক্ষেত্রে আরও দুজন ব্যক্তিকে সাথে নিয়েছিলেন অজয়। অভিনয় করেছেন পায়েল রাজপুত, নন্দিতা শ্বেতা, দিব্য পিল্লাইসহ আরও অনেকে।

সিনেমাটির পোস্টার। ছবি: আইএমডিবি থেকে নেওয়া

প্রায় ১৪৩ মিনিটের ‘মঙ্গলাভরম’-এ ঘটনার শেষ নেই। ছোটবেলার বন্ধুত্বের নানা দিক বেশ ভালোভাবেই ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক। সেই বন্ধুত্ব এমনই যে, যৌন হয়রানির প্রতিবাদে নিজের বাবাকে খুন করতেও পিছপা হয় না এক বন্ধু। এর সাথেই আবার মিশে আছে একের পর এক মৃত্যুর সূত্র। সেই সূত্রই খুঁজে বের করার চেষ্টা করে পর্দার নারী পুলিশ কর্মকর্তা। আর সেই অনুসন্ধানে এমন সব ঘটনা বের হয়ে আসে, যাতে চমকে উঠতে বাধ্য হয় একজন দর্শক।

হ্যাঁ, এই সিনেমার ঘটনায় প্যাঁচ আছে অনেক। কনটেন্টের দুনিয়ায় এই প্যাঁচের আনুষ্ঠানিক নাম অবশ্য ‘টুইস্ট’। স্বীকার করতেই হয়, ‘মঙ্গলাভরম’ দেখতে দেখতে এত এত টুইস্টে একটু ক্লান্তই লাগে। শেষের দিকটায় এমনও মনে হচ্ছিল যে, যুক্তিতে যেহেতু মিলছে না, তবে নিশ্চয়ই ঘটনায় টুইস্ট আছে! এ নিয়ে বিভিন্ন সমালোচকও কিছুটা নেতিবাচক মন্তব্যই করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, মঙ্গলাভরমে টুইস্ট ছাড়া আর কিছুই যেন নেই!

তবে সেসব সমালোচনাকে এক পাশে সরিয়ে রেখে যদি একটু মেঘলা আবহাওয়ায় ছবিটি দেখতে বসেন, সে ক্ষেত্রে একেবারে হতাশ হতে হবে না। গ্রামের পটভূমিতে রহস্যের ঘনঘটা পর্দায় বেশ ভালোভাবেই ফুটে উঠেছে। এই সিনেমাকে অনেক বোদ্ধাই ‘সাহসী’ বলছেন। কারণ, এতে প্রেমের পাশাপাশি যৌনতা বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের বিষয়টি বেশ সরাসরি উঠে এসেছে। আমাদের এই উপমহাদেশীয় সমাজে গ্রামীণ বা শহুরে যে পরিবেশই হোক, সেখানে নারীরা সম্পর্কে ঠকে যায় প্রায়শই। এর পরের ঘটনাপ্রবাহে ভুগতে হয় তাঁদেরই বেশি। কখনো কখনো সমাজ আগ বাড়িয়ে কোনো নারীর চরিত্র নিয়ে দুর্নাম ছড়াতেও ভুল করে না। মঙ্গলাভরম ছবির প্রধান চরিত্র শৈলজাকেও সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। জীবনের পদে পদে হতে হয়েছে অন্যায়ের শিকার। আর এমন এক শারীরিক পরিস্থিতিতে তাকে শিকারে পরিণত হতে হয়েছে, যা অনেকেরই ভাবনার অতীত।

সিনেমাটির আরেকটি দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

ভারতের দক্ষিণাঞ্চলের এই ছবিকে রহস্যাবৃত করতে বড় ভূমিকা রেখেছে বি. অজনীশ লোকনাথের সুর। পুরো ছবিতে তাঁর সংগীতায়োজন ছিল এক শব্দে—দুর্দান্ত। এই সুরকার বহুল আলোচিত ‘কান্তারা’ ছবিটিতে সুর ও সংগীতায়োজন করেছিলেন। যদিও মঙ্গলাভরম দেখতে দেখতেও আপনাদের মনে পড়ে যেতে পারে কান্তারার কথা। বেশ কিছু জায়গায় অদ্ভুত মিল আছে দুটি ছবিতে। কারণ, এই দুই ছবিতেই আঞ্চলিক মিথকে ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে মেশানোর চেষ্টা দেখা গেছে। সেই চেষ্টা যে একেবারে বিফল হয়নি, তা বলাই যায়।

এবার আসা যাক মঙ্গলাভরম ছবির ক্লাইম্যাক্স প্রসঙ্গে। এক বাক্যে বললে—এর ক্লাইম্যাক্স দেখার পর পুরো ছবিটির ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবার ইচ্ছে আপনার জাগবেই। চমকে যে দেবে, সেটি হলফ করেই বলা যায়। এমন উপসংহারের দেখা অনেকদিন মেলে না। শেষটায় এই ছবির সিক্যুয়েলের ইঙ্গিতও আছে জোরেশোরে।

চাইলে ছবির শেষটা বলে দেওয়াই যায়। তবে সেটি করলে, পর্দায় দেখে চমকে ওঠার আনন্দ আর রোমাঞ্চ থেকে বঞ্চিত হতে হবে। তাই নিজ চোখেই না হয় দেখুন। ছবিটি দেখার জন্য ধরা ধৈর্য্য বিফলে যাবে না।

রেটিং: ৪/৫
পরিচালক: অজয় ভূপথি
গল্প ও চিত্রনাট্য: অজয় ভূপথি
অভিনয়শিল্পী: পায়েল রাজপুত, নন্দিতা শ্বেতা, দিব্য পিল্লাই প্রমুখ
ভাষা: তেলুগু
ধরন: অ্যাকশন, হরর, থ্রিলার 
মুক্তি: ১৭ নভেম্বর ২০২৩/ ডিজনি প্লাস হটস্টার