এক মানুষ যেভাবে আরেক মানুষকে খুন করে

তিন গল্পের সিনেমা। ছবি: জি ফাইভ
এক মানুষই আরেক মানুষকে আখ্যা দেয় ‘জানোয়ার’ হিসেবে। বলে যে, ওই মানুষটা জানোয়ারের মতো। তাই মনুষ্য সমাজে সেই জানোয়াররূপী মানুষের আর থাকার উপায় নেই। এভাবে কাউকে কাউকে একঘরে করে দেওয়া হয়। ঠেলতে ঠেলতে এতটাই দূরে সরিয়ে দেওয়া হয় যে, ওই মানুষটা নিঃশ্বাস নিতেও ভয় পায়! একপর্যায়ে হয়তো তাই নিজেকেই সরিয়ে নেয় পুরোপুরি।

মানুষের কারণে মানুষের উবে যাওয়ার এই বাস্তবতা অনেকটাই উঠে এসেছে ‘লানতারানী’ সিনেমায়। ব্যঙ্গাত্মক ঢঙে এই সিনেমায় তিনটি গল্প বলা হয়েছে। পুরো সিনেমাটি ‘ধরনা মানা হ্যায়’, ‘হুড হুড দাবাং’ ও ‘স্যানিটাইজড সমাচার’—এই তিনটি গল্পের সংকলন। এই অ্যান্থোলজির ট্রেলার দর্শকদের মধ্যে বেশ আগ্রহ জাগিয়েছিল। ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার বিজয়ী তিন পরিচালক তিনটি গল্প পর্দায় তুলে ধরেছেন। তিনজন পরিচালক হলেন গুরবিন্দর সিং, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় ও ভাস্কর হাজারিকা। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম জি ফাইভে গত ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পেয়েছে ‘লানতারানী’।

জনি ও যিশু। ছবি জি ফাইভ

এই অ্যান্থোলজির মূল সম্পদ হলো গল্প। লিখেছেন দুর্গেশ সিং। এক কথায় বলতে গেলে, গল্প বোনার কাজটি তিনি দুর্দান্ত করেছেন। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অসাধারণ অভিনয় ও নিখুঁত পরিচালনা। সব মিলিয়ে ‘লানতারানী’ দেখা এক অপরূপ অভিজ্ঞতা।

প্রথম গল্পেই দেখা দেন অবসর নিতে যাওয়া ছোট পদের এক পুলিশ কর্মকর্তা। অবসর নেওয়ার আগের দিনটায় তার কাঁধে চাপে এক অপরাধীকে আদালতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব। একেবারে অফিস শেষ হওয়ার আগ মুহূর্তে কারও হাতে ফাইল ধরিয়ে দিলে, যে অনিচ্ছা ওই ব্যক্তিটিকে পেয়ে বসে, ঠিক তেমন অবস্থা। সেই অনিচ্ছার ভাব দারুণভাবে পর্দায় ফুটিয়ে তুলেছেন জনি লিভার। তাঁর মতো অভিনেতাকে এমন চরিত্রে কমই পাওয়া গেছে এর আগে। এ ধরনের চরিত্রে জনি লিভার যে তুলনাহীন, সেটি এখন প্রমাণিত।

প্রথম গল্পে জনির বিপরীতে অভিযুক্ত অপরাধীর চরিত্রে ছিলেন যীশু সেনগুপ্ত। তিনি এমনিতেই ভালো অভিনেতা। এমন উপযুক্ত গল্প পেয়ে যেন আরও জ্বলে উঠলেন। আদালতে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তাঁর সেই অসহায় হাসি যেন গায়ে কাঁটা দেয়। গল্পের শেষটায় এই চরিত্রটিই হন্তারক মানুষের ব্যবহারে পৃথিবী ছাড়তে বাধ্য হয়। পালানোর উপায় পেয়েও পালানোর ইচ্ছাটাই তার মরে যায়। কত আর পালিয়ে বাঁচা যায়, বলুন?

করোনার অংশটি এভাবেই উঠে এসেছে। ছবি: জি ফাইভ

একটি গল্প দৃশ্যায়িত হয়েছে করোনা মহামারির বাস্তবতায়। সেখানে বিজ্ঞাপনের অভাবে মৃতপ্রায় গণমাধ্যম, আর্থিক সংকট, মহামারির বাস্তবতা ও বিজ্ঞাপনের মুখোশে স্রেফ হারিয়ে যাওয়ার বিষয় আছে ভালোভাবেই। কৌতুকের ছলেই উঠে এসেছে এসব। মুখোশটা যখন খুলে যায় একেবারে, তখন স্যানিটাইজার দিয়েও নিকেশ করা যায় না জীবাণু।

আরেক গল্পে মূল চরিত্রে আছেন জিতেন্দ্র কুমার ও মালয়ালম তারকা নিমিশা সজায়ান। দলিত সম্প্রদায়ের এক নারী গ্রামের পঞ্চায়েত সভার সদস্য নির্বাচিত হলেও জাতপাতের প্রশ্নে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়ে। তাকে কেউ গোনাতেই ধরে না। এই অবহেলা থেকে মুক্তি পেতে স্বামীকে নিয়ে ওই নারী সংশ্লিষ্ট একটি সরকারি দপ্তরের বাইরে অবস্থান ধর্মঘটে বসেন। এভাবেই এগিয়ে যায় গল্প। এতে যেমন কোনো ধরনের স্লোগান ছাড়া নীরব ধর্মঘটের বিষয়টি এসেছে, তেমনি সাধারণের অবস্থান টলিয়ে দেওয়ার জন্য অন্য সবার প্রাণান্ত চেষ্টা ও বলপ্রয়োগের ব্যাপারটিও দেখা গেছে দারুণভাবে। সবচেয়ে বড় কথা, কোনো সংলাপ না বলেই জিতেন্দ্র ও নিমিশা কেবল নিজেদের অভিব্যক্তি দিয়েই মাত করে দিয়েছেন।

এ দৃশ্যটি ছিল দাগ কাটার মতো। ছবি: জি ফাইভ

সব মিলিয়ে ‘লানতারানী’ এক নিদারুণ উপলব্ধি জাগায় মনে। গল্প বলার তাড়া নেই এই সিনেমায়। কিছুটা ঢিমেতালে এগিয়ে যায় কাহিনি। সেই আলস্যে সৌন্দর্য আছে বটে, তবে বিরক্তি নেই একেবারেই। বরং একেকটা গল্প শেষ হওয়ার পর কেমন যেন একদলা মেঘ এসে সূর্যের কড়া আলোকে ঢেকে দেয় আলগোছে। তাতে আলোর ছটা কমলেও চারপাশটা যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এতে সত্যটা ধরা দেয় অবিকল্প রূপে। স্বীকার করতেই হবে যে, ওতে মন কিছুটা খারাপও হয়। কেমন এক দীর্ঘশ্বাসে ভরে যায় চারপাশ!

রেটিং: ৪/৫

পরিচালক: গুরবিন্দর সিং, কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায় ও ভাস্কর হাজারিকা 
গল্প ও চিত্রনাট্য: দুর্গেশ সিং
অভিনয়শিল্পী: জনি লিভার, যীশু সেনগুপ্ত, রাজেশ আস্থি, বলরাম দাস, জিতেন্দ্র কুমার, নিমিশা সজায়ান প্রমুখ
ভাষা: হিন্দি
ধরন: অ্যাকশন, থ্রিলার 
মুক্তি: ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪/ জি ফাইভ

লেখক: চলচ্চিত্র সমালোচক ও সাংবাদিক