ঈদ রিভিউ

দুই নৌকায় পা দেওয়া মানুষের গল্প যেমন হয়

জেফার ও চঞ্চল। ছবি: চরকিদুই নৌকায় পা দেওয়াটাকে এই বঙ্গে বেশ নেতিবাচক চোখেই দেখা হয়ে আসছে। কখনো এটিকে দেখা হয় একজন মানুষের নৈতিকতার স্খলন হিসেবে। আবার দুই নৌকায় পা দিলে যে ভারসাম্যও নষ্ট হয়ে যেতে পারে যেকোনো সময়, সেটিও মোরাল অব দ্য স্টোরি হিসেবে এই প্রবাদের মাধ্যমে বোঝানো হয়ে থাকে। ঠিক সেই বিষয়টি মূল হিসেবে নিয়েই এবার পর্দায় এল ‘লাস্ট ডিফেন্ডারস অব মনোগামী’।

ওটিটি প্ল্যাঠফর্ম চরকি চাঁদরাতে নিয়ে এসেছে এই অরিজিনাল ফিল্ম। ঘরানা হিসেবে বলা হয়েছে ‘কমেডি-ফ্যামিলি-রোমান্স’। ৮৪ মিনিট দৈর্ঘ্যের ছবিটির পরিচালক মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। পরিচালকের এই নামটিই ছবিটির ব্যাপারে কোনো দর্শককে আগ্রহী করে তুলতে যথেষ্ট।

মনোগামীর দুই প্রধান চরিত্র। ছবি: চরকি

ছবিটির গল্প সম্পর্কে চরকি লিখেছে, ‘স্ত্রী–সন্তান নিয়ে সুখী শাফকাত ‘মনোগামী’ দর্শনে বিশ্বাসী মানুষ। তার অফিসে তরুণী কপিরাইটার লামিয়া যোগ দেওয়ার পরই শাফকাতের দর্শন ও প্রবৃত্তির দ্বন্দ্ব শুরু হয়।’

এ থেকেই বোঝা যায় মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ও এর ধরন নিয়ে এগিয়েছে সিনেমার গল্প।

শুরুতে সব স্বাভাবিকই থাকে। ধীরে ধীরে শাফকাত ও লামিয়ার সম্পর্কের ঘনত্ব গাঢ় হতে থাকে। বয়সের পার্থক্যের কারণেই লামিয়া ও শাফকাতের ধ্যান-ধারণায় এক ধরনের ব্যবধান দৃশ্যমান থাকে। দুজনের জন্যই এটি আসলে দ্বিতীয় সম্পর্ক। প্রথম সম্পর্কে থেকেই দ্বিতীয় এই সম্পর্ক চলতে থাকে সমান্তরালে। চলতে চলতে তা কখনো কখনো সাংঘর্ষিক হয়েও দাঁড়ায়। আর এভাবেই যেকোনো দর্শক সিনেমার নামের সঙ্গে এর কাহিনির বিপরীত সম্পর্ক বুঝে যান নিমিষেই।

এই সিনেমার গল্প বানানো কিছু না। ঢাকা নামক মহানগরে যারা বসবাস করেন, তাঁরা কানে-মুখে এই ধরনের ঘটনা প্রায়শই শুনে থাকেন। সাধারণত এমন ঘটনা গসিপের মূল উপকরণ হয়, বাসস্থান বা কর্মস্থল—দুই জায়গাতেই। এটি কারও জন্য ‘বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক’ নামে পরিচিত হয়। কারও ক্ষেত্রে আবার এটি রূপ নেয় একটি রুটিন সম্পর্ক থেকে হাঁফ ছাড়ার স্থান হিসেবে। অসন্তুষ্টি কি এমন সম্পর্কের চালিকাশক্তি হয়? কখনো হয়, কখনো আবার স্রেফ অন্য পথে পা বাড়িয়ে ফেলা। সেই পথ ভুল না ঠিক, তার সংজ্ঞা হয়তো আমরা নির্ধারণ করি অনেক পরে।

‘লাস্ট ডিফেন্ডারস অব মনোগামী’ নামের সিনেমায় অভিনয়ে ছিলেন চঞ্চল চৌধুরী, জেফার রহমান, সামিনা হোসেন প্রেমা, শুদ্ধ, প্রত্যয়ী প্রথমা রাই প্রমুখ। মূলত চঞ্চল ছিলেন শাফকাত হিসেবে। লামিয়া হয়ে ছিলেন জেফার। বলতেই হয় যে, চঞ্চল যে অভিনয় দক্ষতা দেখিয়েছেন সেটি কাঙ্ক্ষিতই। তাঁর কাছ থেকে যেমন অভিনয় দর্শকেরা প্রত্যাশা করে থাকেন, তিনি সেটি পূরণ করেছেন নিখুঁতভাবে। তবে সাধারণত গায়িকা হিসেবে পরিচিত জেফার রহমান প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছেন বিরাট ব্যবধানে। অত্যন্ত স্বাভাবিক লয়ে তিনি অভিনয় করেছেন। আর সেই স্বাভাবিক সাধারণ অভিনয়ের জন্যই ‘সুন্দর’ বিশেষণটি ব্যবহারযোগ্য। এই সিনেমার অভিনয়শিল্পীদের সবচেয়ে ভালো দিকটি হলো, চরিত্র ছোট-বড় যা-ই হোক না কেন, তাতে কোনো ছন্দপতন দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়নি। ফলে তরতরিয়ে দেখে ফেলা যায় পুরো সিনেমা। কোথাও হোঁচট খেতে হয় না। এর জন্য পরিচালকেরও ধন্যবাদ প্রাপ্য।

তাদের ঘনিষ্ঠতা। ছবি: চরকিতবে পর্দায় শাফকাতের সঙ্গে লামিয়ার সম্পর্কের ঘনত্বটা যেন হুট করে বাড়ানো হলো। এটিকে আরেকটু ধীর লয়ে করাই যেত। তাতে সিনেমার দৈর্ঘ্য বাড়লেও দর্শকদের খারাপ লাগত না হয়তো। আর শুদ্ধ কীভাবে ক্র্যাচ ব্যবহার করবে, তাতে নজর দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। এতে সিকোয়েন্সের ডিটেইলিং আরও ভালো হতো।

ক্রাচে ভর দিয়ে শুদ্ধ। ছবি: চরকিএমন দু-একটি বিষয় বাদ দিলে পরিচালক ফারুকী যে গল্প দেখাতে চেয়েছেন পর্দায়, তাতে তাঁকে সফল বলাই যায়। তিনি কোনো পক্ষ নেননি, কোনো দিকে ঝুঁকেও যাননি। দ্বিতীয় সম্পর্কে জড়ানো মানুষের অপরাধবোধকে যেমন ফুটিয়ে তুলেছেন, তেমনি প্রবৃত্তির প্রবলতাকেও এড়িয়ে যাননি। আবার প্রতারণায় কখনো কখনো যে কথিত প্রতারকও আহত হয় গভীরভাবে, সেই বাস্তবতাকেও অস্বীকার করেননি। যেকোনো ঘটনার এমন নৈর্ব্যক্তিক পর্যবেক্ষণ ভালোই লাগে। এতে দর্শকদের একটা ফ্রি ফলে’র অনুভূতি দেওয়া যায় সহজেই। যার যার মনোভাব অনুযায়ী যে কেউ যেকোনো কিছু ভেবে নিতে পারে। ছবির পরিচালক সেখানে হেডমাস্টারের মতো অ্যাসেম্বলির লাইন সোজা করতে বেত হাতে দায়িত্ব নেন না! বরং ভাবনার দায়িত্বটা দর্শকদের কাঁধেই বর্তায়।

সব মিলিয়ে ‘লাস্ট ডিফেন্ডারস অব মনোগামী’ সিনেমা হিসেবে মসৃণ। মেদ নেই। হ্যাঁ, এটি কোনো অভূতপূর্ব গল্প নয়, উল্টো বড্ড চেনা-শোনা। তবে এই সিনেমা দেখতে বসলে বিরক্তির উৎপাদন খুব একটা হয় না। কারণ, গল্পকে রাবারের মতো টানা হয়নি কোথাও। শেষটায় এসে আপনার মনে এক ধরনের মায়ার অনুভূতিই জন্মাবে। সেই মায়া সততা-অসততার বোধকে একপাশে সরিয়ে একজন মানুষের চোখের জলকে প্রাধান্য দেয় বেশি। সেই অশ্রু গ্লিসারিনজাত নয় অবশ্যই। বরং তাতে দুঃখ ও বিষাদেরা জলকেলি করে অস্থিরচিত্তে।

রেটিং: ৪.২/৫

পরিচালক: মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
গল্প ও চিত্রনাট্য: মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
অভিনয়শিল্পী: চঞ্চল চৌধুরী, জেফার রহমান, সামিনা হোসেন প্রেমা, শুদ্ধ, প্রত্যয়ী প্রথমা রাই প্রমুখ 
ভাষা: বাংলা
ধরন: কমেডি-ফ্যামিলি-রোমান্স
দৈর্ঘ্য: ৮৪ মিনিট
মুক্তি: ১০ এপ্রিল ২০২৪/ চরকি

লেখক: চলচ্চিত্র সমালোচক ও সাংবাদিক