মির্জাপুর থ্রি: টুইস্টের বন্যায় ভায়োলেন্স ফ্রি!

ওটিটির দুনিয়ায় সিরিজ বা সিনেমায় টুইস্ট থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। সেটা বেশ ভালো পরিমাণেই আছে ‘মির্জাপুর’ সিরিজের তৃতীয় কিস্তিতে। একেবারে ভরপুর যাকে বলে। আর সেই সাথে সহিংসতা ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বিট লবণ হিসেবে। ভায়োলেন্স দেখানোর দিক থেকে ‘মির্জাপুর’‑এর এবারের সিজন আগেরগুলোর তুলনায় আরও দুঃসাহসী। কখনো কখনো তা চোখের জন্য পীড়াদায়ক কিনা, সেই প্রশ্নটাও উঠে যায় খানিকটা!

পঙ্কজ ত্রিপাঠী। এবারও ছিলেন দুর্দান্ত। ছবি: প্রাইম ভিডিওবলতেই পারেন, মির্জাপুর তো সব সময় এমন একটা পৃথিবীর কথা বলছে, যেখানে বাহুবলই শেষ কথা। আগের দুই সিজনেও এমন ধারার গল্পেই পর্ব এগিয়েছে। তবে এবার যেন সহিংসতা দেখানোর দিক থেকে অতীতের উদাহরণ ছাড়িয়ে গেছে সিজন থ্রি।

মির্জাপুরখ্যাত অভিনেতা আলি ফজল সংবাদমাধ্যমের কাছে বলেওছেন যে, এ ক্ষেত্রে আরেক বিখ্যাত ব্রিটিশ সিরিজ ‘পিকি ব্লাইন্ডার্স’কে অনুপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল।

সেদিক থেকে ধরলে উপমহাদেশের সহিংস ওয়েব সিরিজের ইতিহাসে একটি নতুন সংযোজন ‘মির্জাপুর সিজন থ্রি’। সম্প্রতি বৈশ্বিক ওটিটি প্ল্যাটফর্ম প্রাইম ভিডিওতে মুক্তি পেয়েছে এটি। পরিচালক হিসেবে আছেন গুরমিত সিং ও আনন্দ আইয়ার।

মির্জাপুর-৩ পোস্টার। ছবি: প্রাইম ভিডিওমির্জাপুর সিরিজের গল্প মোটামুটি সবার জানা। যেহেতু এর আগে দুটি সিজন হয়ে গেছে, এবং সেগুলো তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে, তাই মির্জাপুর কী নিয়ে—সেটি কিছুটা সুবিদিতই। তারপরও বলতে হলে, মির্জাপুর আসলে কালীন ভাইয়া (পঙ্কজ ত্রিপাঠী) ও গুড্ডু ভাইয়ার (আলি ফজল) সংঘাতের গল্প। কালীন ভাইয়া আন্ডারওয়ার্ল্ডের অবিসংবাদিত ডন, আর তার চরম প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছেন গুড্ডু। এরপর শুরু সিংহাসনের লড়াই। প্রথম সিজনে তৈরি হয় গুড্ডুর প্রতিশোধ নেওয়ার কারণ, দ্বিতীয় সিজনে সেই প্রতিশোধ নেওয়া সম্পন্ন হয় কালীন ভাইয়ার আহত ও তার ছেলে মুন্না ভাইয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। তৃতীয় সিজন শুরু হয়েছে মুন্নার সৎকারের অনুষ্ঠান দিয়ে। অর্থাৎ, ঠিক যেখানে সিজন টু শেষ হয়েছিল, সেখান থেকেই শুরু সিজন থ্রি। ২০১৮ সালে এসেছিল প্রথম সিজনটি। এর দুই বছর পর আসে দ্বিতীয়টি। সেই হিসাবে তৃতীয় সিজন আসতে প্রায় ৪ বছরের মতো সময় লেগেছে। কিন্তু মজার বিষয় হলো, দেখতে বসলে আপনার মনেই হবে না যে, মাঝখানে একাধিক বছর চলে গেছে! সেই পুরনো উত্তেজনা আর টানটান গল্প তৃতীয় সিজনের প্রথম পর্ব থেকেই একজন দর্শককে আগের মতোই টেনে রাখে। ফলে নতুন সিজন দেখতে গিয়ে হোঁচট খেতে হয় না। এর জন্য সিজন থ্রি’র শিল্প নির্দেশনাও প্রশংসার দাবি রাখে।

তৃতীয় সিজনের প্রথম থেকেই গুড্ডু ভাইয়ার চরিত্রটি যতটা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে, কিছুটা ফিকে হতে থাকে কালীন ভাইয়া। গল্পের ধারা অবশ্য তেমনই ছিল। তবে কালীন ভাইয়া হিসেবে পঙ্কজ ত্রিপাঠী তৃতীয় সিজনের শেষের দিকে ধীরে ধীরে মুখ্য চরিত্র হয়ে ওঠেন। কালীন ভাইয়ার সেই আগেকার ঝলক আবার ফিরে আসে। আর তাতেই পুরোপুরি জমে ওঠে ‘মির্জাপুর সিজন থ্রি’।

অভিনয়ের প্রসঙ্গে শুরুতেই আসে পঙ্কজ ত্রিপাঠী ও আলি ফজলের পারফরম্যান্স। সিজনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দুর্দান্ত ছিলেন আলি ফজল। বিশেষ করে অষ্টম পর্ব থেকে তাঁর চরিত্রে দারুণ পরিবর্তন আসে। তাতে নিজের অভিনয় ক্ষমতার দুরন্ত প্রদর্শন করেছেন আলি। একইভাবে নবম ও দশম পর্বেই কালীন ভাইয়া হিসেবে পঙ্কজ ত্রিপাঠীর চরিত্রটি প্রাধান্য পেতে শুরু করে। আর এই চরিত্রের রূপান্তরের বিষয়টি ছিল একেবারেই মসৃণ। কোথাও তিল পরিমাণ বিচ্যুতি দৃষ্টিগোচর হয় না।

মির্জাপুরের অন্যতম তিন চরিত্র। ছবি: প্রাইম ভিডিওএই দুই প্রধান চরিত্রের পাশাপাশি অন্যগুলোর মধ্যে গোলু চরিত্রে শ্বেতা ত্রিপাঠী শর্মা ছিলেন অসাধারণ। সিজন টু’তে দেখা যাওয়া মাধুরীরূপী ঈশা তালওয়ার সিজন থ্রি’তে গুরুত্ব পেয়েছেন আগের চেয়ে বেশি। তাতে তাঁর নৈপুণ্য ছিল গড় মানের। ওদিকে আগের দুই সিজনে কালীন ভাইয়ার স্ত্রী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হয়ে ওঠা রাসিকা দুগালকে কিছুটা পিছু হটতে হয়েছে। তবে যতটুকুই সুযোগ পেয়েছেন, তার সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার তিনি করেছেন। এর বাইরে আরও কিছু চরিত্র এবারের সিজনে পূর্ণ হয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে। কিছু চরিত্রে যতিও পড়েছে। তবে সব মিলিয়ে অভিনয় নিয়ে অভিযোগ করার সুযোগ খুবই কম। তবে হ্যাঁ, ‘পঞ্চায়েত’খ্যাত জিতেন্দ্র কুমারকে স্ক্রিনে আশা করে দেখতে বসলে নিরাশ হতেই হবে। ওটি আসলে গুজবই, আর কিছু না!

অভিযোগ আছে মূলত এই সিজনের গল্পের ধরন নিয়ে। স্বাভাবিকভাবেই প্রথম ও দ্বিতীয় সিজনে দুই পক্ষের প্রতিশোধ‑পাল্টা প্রতিশোধের একটা বিষয় ছিল। এতে করে দর্শকেরা আগ্রহও বোধ করেছেন বেশি। কিন্তু সিজন থ্রি সেক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। গল্পের নতুন ধারা এখানে সৃষ্টি করতে হয়েছে, হয়তো আরও সিজন বানানোর জন্যই। আর সেটি করতে গিয়েই কিছু কিছু ক্ষেত্রে দর্শকদের বিরক্তির উদ্রেক হতেই পারে। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এই অনুযোগ উঠে গেছে যে, সিজন থ্রি মির্জাপুর সিরিজের সবচেয়ে বোরিং সিজন কিনা! এই অনুযোগকে শতভাগ খারিজ করা আসলে কঠিন। আগের দুই সিজনের হাইপের কথা তুলনায় নিলে একটু হতাশ হতেই হবে। তবে এবারের সিজনের শেষ পর্বে গিয়ে নতুন সিজনের ঘোষণা এক অর্থে দিয়েই দেওয়া হয়েছে। সেক্ষেত্রে সিজন ফোরে হয়তো নতুন রূপেই আবির্ভূত হতে পারে ‘মির্জাপুর’। আর সেটি না হলে কিন্তু জনপ্রিয়তায় ভাটার টান তীব্র হবেই!

‘মির্জাপুর’ সিরিজের সিজন থ্রি তাহলে কেমন? এক শব্দে বললে, উপভোগ্য। ১০ পর্বের প্রতিটির দৈর্ঘ্য ৪০ মিনিটের বেশি, কোনোটা তো প্রায় এক ঘণ্টা। তা সত্ত্বেও টানটানই ছিল গল্প। একটু ঢিলেঢালা যখনই বোধ হতে শুরু করে, ঠিক তখনই চমক জাগানিয়া টুইস্টে ঝাঁকি দেওয়া হয়েছে দর্শকমনে। দর্শকের চোখে অস্বস্তি জাগানোর মতো সহিংসতার পরিমাণও ছিল অনেক। তবে সিজনের শেষ পর্ব দেখে ফেলার পর কিছুটা অপূর্ণতা জাগতেই পারে, অতৃপ্তিও থাকতে পারে। আর এটাই ‘মির্জাপুর’ সিরিজের সিজন থ্রি‑এর একমাত্র ব্যর্থতা! 

রেটিং: ৪.৫/৫.০০
   
পরিচালক: গুরমিত সিং ও আনন্দ আইয়ার
গল্প ও চিত্রনাট্য: পুনিত কৃষ্ণ, করণ আংশুমান
অভিনয়শিল্পী: পঙ্কজ ত্রিপাঠী, আলি ফজল, বিজয় বর্মা, রসিকা দুগ্গাল, শ্বেতা ত্রিপাঠি, লিলিপুট প্রমুখ
ভাষা: হিন্দি
ধরন: ক্রাইম থ্রিলার, অ্যাকশন, ড্রামা
মুক্তি: ৫ জুলাই ২০২৪, আমাজন প্রাইম ভিডিও

লেখক: সাংবাদিক ও চলচ্চিত্র সমালোচক