গুটি’র কতটা শক্ত খুঁটি?

অর্ণব সান্যাল, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

গল্পের শুরুটা পথে। সেই পথের যাত্রী সুলতানা। পথ পাড়ি দিয়েই তার আয় হয়, আয় হয় শরীরকে কষ্ট দিয়ে। সেই সঙ্গে আছে আবার আইনের চোখ ফাঁকি দেওয়ার লুকোচুরি খেলা। পথ থেকে ঘরে থিতু হওয়ার চেষ্টা চলে সুলতানার। কিন্তু পথ কি ছাড়ে সুলতানাকে? নাকি পালানোর হিসাবে এক পথ থেকে আরেক পথে পাড়ি জমানোই সুলতানার একমাত্র ভবিতব্য?

গল্পের শুরুর মতো আপাতভাবে হওয়া শেষটাতেও সুলতানার জন্য পথই একমাত্র অবলম্বন। সেই পথে অবশ্য তাড়া আছে, পালিয়ে বেড়ানোর তাড়া। হোঁচট খেতে খেতে এই আতঙ্কেই এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে দৌড়ে বেড়ায় সুলতানা। তাতেও স্বস্তি কোনোভাবেই ধরা দেয় না তার জীবনে। সেখানে যেন অস্বস্তি আর বিপত্তি বাদে কিছু নেই।

ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকি নিয়ে এসেছে অরিজিনাল সিরিজ ‘গুটি’। শঙ্খ দাশগুপ্তের পরিচালনায় নির্মিত ‘গুটি’র গল্প সম্পর্কে চরকি বলছে, ‘সুলতানা একজন মাদক পাচারকারী এবং একজন মা। কয়েক বছর ধরে স্থানীয় মাদক চোরাচালান নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। এই সময়ের মধ্যে সুলতানা প্রচুর অর্থ ও সম্পদ অর্জন করেছে, কিন্তু বিনিময়ে হারাতে হয়েছে কাছের মানুষ, সম্পর্ক, বিশ্বাস ও আশা। পালানোর কোনো পথ নেই, তবু পালানোই হয়ে ওঠে সুলতানার একমাত্র পথ।’

সুলতানা জীবনের চাকা সচল রাখতেই বেছে নিয়েছিল বাঁকা পথ। সেই পথে সাময়িক স্বস্তি এলেও, সুখ আর কখনোও ধরা দেয়নি। উল্টো হারিয়ে গেল মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি অনুষঙ্গ - আস্থা, বিশ্বাস ও আশা। তারপরও সিরিজের শেষে জীবনের দরিয়ায় প্রাণ বাঁচানোর তাগিদেই আশার ভেলায় ফের চড়ে বসে সুলতানা। কিন্তু তাতেও কি আর শেষ রক্ষা হয়!

এই সুলতানাকে দেখে মনে পড়ে যায় আরেক সুলতানার কথা। ১৯০৫ সালে বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন প্রকাশ করেছিলেন ‘সুলতানা’স ড্রিম’। কিংবদন্তি এই রচনায় এমন এক লেডি-ল্যান্ডের বর্ণনা দেওয়া হয়েছিল, যেখানে নারী ও পুরুষের চিরাচরিত সমাজনির্মিত ভূমিকা পুরোপুরি উল্টে গিয়েছিল। সেখানে নারীরা ছিল বাইরে, পুরুষেরা ছিল অন্তঃপুরবাসী। সেখানে ছিল না কোনো অপরাধ। ছিল না বাল্য-বিবাহ, দুর্ভিক্ষ বা মহামারি। সে রাজ্যের মূল ভিত্তি ছিল সত্যবাদিতা, ভালোবাসা ও মানবতা।


'গুটি' ওয়েব সিরিজে আজমেরী হক বাঁধন

সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেঁকে বসা পুরুষতন্ত্রের তুলনায় নারীদের জন্য সেই কল্পিত স্বর্গরাজ্যের ঠিক উল্টোটাই যেন ‘গুটি’র সুলতানার বাস্তবতা। সেখানে কম-বেশি সব পুরুষই সুলতানার জীবনে খলনায়ক রূপে ধরা দেয়। তবে কি ‘গুটি’ পর্দার ‘সুলতানা’স নাইটমেয়ার’?

সিরিজটিতে সুলতানা চরিত্রে অভিনয় করেছেন আজমেরী হক বাঁধন। সুলতানার মতো নারীদের যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবনের অভিব্যক্তি তার চরিত্রে ছিল সিরিজজুড়েই। চরিত্রের প্রয়োজনেই কিছুটা উচ্চকিত ও উত্তেজিত ভঙ্গিমায় অভিনয় করতে হয়েছে বাঁধনকে। তিনি সেই কাজটি সার্থকভাবেই করেছেন। এর সঙ্গে পর্দায় প্রায় নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন বিপথে গিয়ে ফাঁদে আটকে পড়া এক নারীর সবকিছু। বাঁধন যেমন শরীরী ভঙ্গিমায় সুলতানা হয়ে উঠেছেন, তেমনি সাত পর্বের কোনোটিতেই সুলতানার মানসিক গঠন থেকে দর্শককে বিচ্যুত হওয়ার সুযোগ দেননি। ফলে দর্শকেরা কখনোই পর্দায় বাঁধনকে পাননি, পেয়েছেন শুধু সুলতানাকে।


সিরিজটিতে অন্যান্য চরিত্রে অভিনয় করেছেন শাহরিয়ার নাজিম জয়, শরীফ সিরাজ, মৌসুমি হামিদ, নাসির উদ্দিন খানসহ এক ঝাঁক অভিনয়শিল্পী। নাসির উদ্দিন খান বরাবরের মতোই সাবলীল ছিলেন। সিএনজির চালক থেকে ভাড়াটে মাস্তান – কোনো ভূমিকাতেই দর্শকের মনে অবিশ্বাস জন্মাতে দেননি তিনি। মৌসুমি হামিদও পরকীয়া থেকে চরম অসহায় অবস্থায় নিপতিত নারীর চরিত্রকে দক্ষভাবে তুলে ধরেছেন। আলাদা করে বলতেই হয় শাহরিয়ার নাজিম জয় ও শরীফ সিরাজের কথা। কামার্ত ও লম্পট স্বামীর ভূমিকায় জয় ছিলেন তুলনাহীন। একটিবারের জন্যও পর্দায় তাঁকে অপ্রস্তুত মনে হয়নি। ওদিকে সুযোগসন্ধানী মানুষ কেমন হয়, তার চিত্রায়নে ত্রুটি রাখেননি শরীফ সিরাজ।


গুটি’র একটি দৃশ্যে শাহরিয়ার নাজিম জয় ও আজমেরী হক বাঁধন

শঙ্খ দাশগুপ্তের অন্যান্য কাজের মতোই ক্যামেরার সদ্ব্যবহারের কারণে ‘গুটি’ দেখতেও ভালো লাগে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে যোগ্য অভিনয়শিল্পীদের সৎ চেষ্টা এবং বেশ পরিপাটি একটি চিত্রনাট্য। রোমাঞ্চও ছিল ঠাস বুনোটে। ফলে ‘গুটি’ দেখতে গিয়ে ঠকে যাওয়ার আশঙ্কা প্রায় নেই বললেই চলে। দেখতে বসলে কখন যে সাতটি পর্ব একে একে পার হয়ে যাবে, তা হয়তো টেরই পাওয়া যাবে না!

তা এমন একটি সিরিজ আর না দেখে ফেলে রেখে লাভ কি! বরং দেখা শুরু করতেই পারেন ‘গুটি’। সাত নম্বর পর্বের শেষে দ্বিতীয় সিজন দেখার জন্য মন কেমন কেমন করলেই বুঝবেন গুটির খুঁটি কতটা শক্ত!