নিশোর ‘সাড়ে ষোলো’ কি ষোলো আনাই খাঁটি?

প্রত্যেকটি চরিত্রের বিস্তারিত রূপ দেখা দিতে লাগল একে একে। ন্যায়-অন্যায়ের নিক্তি একবার ডানে হেলে, তো একবার বামে। এভাবেই শেষতক যে ঘটনাক্রম সৃষ্টি হলো, সেটিকে এক কথায় কী বলা যায়?

বলা যায় যে, এই দুনিয়া এখন শক্তের ভক্ত, নরমের যম। এখানে টাকা ও ক্ষমতা সবকিছু নির্ধারণ করে। এমনকি খুনিও! তা সেই খুন অনেক মানুষের হোক, বা এক জনের। খুন তো নানা ধরনের হয়। খুনি হওয়ার জন্য সব সময় হাতে ছুরি বা পিস্তল নিতে হয় না। টাকা ও ক্ষমতার বশবর্তী এই সমাজে অনেক বিচ্ছিন্ন স্বার্থের সৃষ্টি হয়। যখন সেই বিচ্ছিন্ন স্বার্থগুলো এক সুতোয় গাঁথা হয়ে যায়, তখনই ঘটে এমন কোনো অপরাধ- যাতে যে বা যারা ফাঁসে, তারা আর সেই গোলকধাঁধা থেকে বের হতে পারে না। সেই গোলকধাঁধা সৃষ্টিকারীরা তখন হয়তো কোথাও অবকাশযাপনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে!

রেজা লুকে নিশো। ছবি- হইচই

এমনই এক গল্প নিয়ে পরিচালক ইয়াছির আল হক বানিয়েছেন ‘সাড়ে ষোলো’। অতি সম্প্রতি স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম হইচই-এ এটি মুক্তি পেয়েছে। হইচই বলছে এটি ৬ পর্বের মিস্ট্রি ড্রামা। তার ইঙ্গিত অবশ্য এর ট্রেলারেই পাওয়া গিয়েছিল।

এর গল্প সম্পর্কে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মটি লিখেছে, ‘বিখ্যাত আইনজীবী রেজার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শুনানির প্রাক্কালে ভায়োলেট ইন হোটেলের সাড়ে ষোলো তলায় ঘটে যাওয়া এক রহস্যজনক মৃত্যু তাকে এক মরণফাঁদে ফেলে দেয়। একদিকে যখন তার শত্রুরা প্রতিমুহূর্তে তার পতনের জন্য অপেক্ষা করছে, তখন রেজা কি পারবে নিজেকে এই মরণডঙ্কা থেকে উদ্ধার করতে?’

মূলত এই প্রশ্নের উত্তরই খোঁজা হয়েছে ‘সাড়ে ষোলো’-তে। সেই সঙ্গে মিস্ট্রি ড্রামার সেই পরিচিত ‘হু ডান ইট’ ভঙ্গিতে খুনি ধরার চেষ্টা চলেছে ভালোমতোই। প্রথম পর্বের শেষ দিকে একটা চমক ছিল। গল্পের শেষে যেভাবে ডকুমেন্টারির ভঙ্গিতে অপরাধের শিকার মানুষের ক্ষতির চিত্র দেখানো হয়েছে, এটা বেশ আকর্ষণীয়। প্রথম পর্বের পর থেকেই ন্যূনতম খোঁজখবর রাখা দর্শকেরা দেশের একটি অত্যন্ত পরিচিত ট্র্যাজেডির সঙ্গে ‘সাড়ে ষোলো’র গল্পের যোগসূত্র ও মিল খুঁজে পাবেন। ফলে ওই ডকুমেন্টারির সঙ্গে নিজেদের মন ও মগজকে খাপ খাইয়ে নেওয়া অনেকটাই সহজ।

দ্বিতীয় থেকে ষষ্ঠ পর্ব পর্যন্ত মূলত কিছুক্ষণ বা কয়েক দিন বা কয়েক বছর আগে ঘটে যাওয়া ঘটনার সঙ্গে বর্তমানকে যুক্ত করার চেষ্টা চলেছে। এমন ধারার নির্মাণ ওটিটির বিশ্ববাজারে সুলভ। তবে বাংলাদেশি নির্মাণে এমনটা সচরাচর দেখা যায় না। সেদিক থেকে ধরলে, সাড়ে ষোলো অবশ্যই ভিন্ন স্বাদ দেয়। এর গল্পের বয়ে চলা এবং পর্দায় তার চিত্রায়ন দেখলে স্মার্ট মনে না হওয়ার কারণ নেই।

তবে এও ঠিক যে, একটি নির্দিষ্ট ঘটনাকে কেন্দ্রে রেখে অতীতের সঙ্গে বর্তমানকে যখন আপনি সমান্তরালভাবে দর্শকদের সামনে তুলে ধরবেন, তখন সেই নির্দিষ্ট ঘটনার ডিটেইল খুব সন্তর্পণে একই রাখতে হয়। কারণ, এসব ক্ষেত্রে চরিত্রের সমারোহ কম থাকে এবং একই ঘটনা বারবার দর্শকদের সামনে হাজির হয় ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। এমনই কিছু ডিটেইলে কিছু সমস্যা ছিল বটে। বেখাপ্পা লেগেছে প্রতিটি চরিত্রের মুখে ‘ফাক’ সংক্রান্ত শব্দ বসিয়ে দেওয়াটাও। মনে হয়েছে, বাঙালিরা কেউ বাংলায় গালি জানেই না! একই সঙ্গে দুই ঘটনার মাঝখানে কতগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনা ঘটে যেতে পারে এবং সেগুলোর টাইমফ্রেম কী দৈর্ঘ্যের হবে, সে ব্যাপারেও আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন ছিল। আর কারও নাম মোবাইলে ‘ভাই’ হিসেবে সেভ করলে, তাকে ভাই নাকি সাহেব ডাকা হয় সাধারণত, সেটিও একটু হিসাবে রাখলে ভালো হতো।

অবশ্য এসব ফাঁক-ফোঁকড় বেশ খানিকটা ঢেকে গেছে অভিনয়শিল্পীদের নৈপুণ্যে। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র উকিল রেজা হিসেবে ছিলেন আফরান নিশো। হাজারো সমস্যা বা ফাঁদে জড়িয়েও একজন ‘সুপার কুল’ উকিলের চরিত্রে তিনি অসাধারণ অভিনয় করেছেন। তাঁর চোখ থেকে শুরু করে সার্বিক বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, সবই খাপে খাপ মিলে গেছে। কখনোই মনে হয়নি যে, নিষ্ঠুর ও সুযোগসন্ধানী রেজা পর্দায় অনুপস্থিত।

রাকিব হয়েছেন দিনার। ছবি- হইচই

অন্যদিকে ওপরে ওঠার জন্য যেকোনো কিছু করতে পারা রাকিব চরিত্রে ইন্তেখাব দিনার অনবদ্য। ওটিটির দুনিয়ায় সাপোর্টিং রোলে নিজের সামর্থ্য তিনি এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠা করেছেন। এখন সময় এসেছে শুধু তাঁকে গল্পের কেন্দ্রে রেখে চরিত্র নির্মাণ করা। তিনি এর যোগ্য দাবিদার।

সাংবাদিকের চরিত্রে জাকিয়া বারী মম এবং পুলিশ অফিসারের চরিত্রে ইমতিয়াজ বর্ষণ বিশ্বাসযোগ্য ছিলেন। ভালো অভিনয় করেছেন আফিয়া তাবাসসুম বর্ণ, ইরফান রনি, শাহেদ আলী ও কাজী নওশাবা আহমেদ। সব মিলিয়ে অভিনয়শিল্পীদের নৈপুণ্যে খুব একটা ঘাটতি আসলে দেখা যায়নি পুরো সিরিজে। সবচেয়ে বড় কথা, ডার্ক ক্যারেক্টারে সুপরিচিত অভিনয়শিল্পীদের এত সাবলীল অভিনয় সত্যিই নজর কাড়ে।  

মম যখন রিনি। ছবি- হইচই

‘সাড়ে ষোলো’র শেষটা চিত্তাকর্ষক। মিস্ট্রি ড্রামার জন্য যথার্থ। পরবর্তী সিজন আসার একটি দুর্বল ইঙ্গিতও আছে। এক কথায়, ‘সাড়ে ষোলো’ দেখা সময়ের অপচয় নয় কোনোভাবেই। দেখা শেষের পর একটা দুঃখবোধ ও ক্ষোভ আপনাকে গ্রাস করবেই। কিছুটা ভাবনার অবকাশও সৃষ্টি করে তা। এমন মোমেন্টাম সৃষ্টি করতে পেরেছেন পরিচালক। সব মিলিয়ে, ‘সাড়ে ষোলো’ ষোলো আনা খাঁটি না হলেও, বারো আনা তো বটেই।

তাহলে আর অপেক্ষা কিসের? চলে যান ভায়োলেট ইন হোটেলের সাড়ে ষোলো তলায়! রহস্যের মোড়কে এক চূড়ান্ত স্বার্থপর পৃথিবী অপেক্ষা করছে আপনার জন্য।