প্রোডাকশন ম্যানেজারকে মেরে কানের পর্দা ফাটানোর অভিযোগ নির্মাতার বিরুদ্ধে

পরিচালক রুবেল আনুশের নামে জিম্মি করে মারধর ও মোটর সাইকেলের কাগজপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন তাঁরই প্রোডাকশন ম্যানেজার দ্বীন ইসলাম দিনার। বৃহস্পতিবার (২৭ মে) মগবাজারের একটি ক্লাবে এই ঘটনা ঘটেছে। এ সময় দিনারের সঙ্গে ছিলেন আরেক নির্মাতা ইমাম হোসেন শামীম, যিনি সম্প্রতি আনুশের কয়েকটি নাটকে নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে কাজ করেছেন। 

আনুশের বিরুদ্ধে দিনার ও শামীমের অভিযোগ, মিটিংয়ের কথা বলে রাত পৌনে চারটা পর্যন্ত আটকে রেখে তাঁদের ওপর শারীরিকভাবে নির্যাতন চালিয়েছেন নির্মাতা আনুশ। মূলত শুটিংয়ের পাওনা টাকার লেনদেন নিয়েই এই বিরোধের সৃষ্টি। দুই পক্ষই একে-অপরের কাছে টাকা পাবে বলে দাবি করছে।        

এ বিষয়ে নাট্য পরিচালকদের সংগঠন ডিরেক্টরস গিল্ডের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন দ্বীন ইসলাম দিনার। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ‘গত রোজার ঈদের আগে থেকে এখন পর্যন্ত পরিচালক জনাব রুবেল আনুশের সাথে ঢাকা, মানিকগঞ্জ, নিকলীতে (কিশোরগঞ্জ) বেশ কয়েকটি নাটকের শুট করি। শুটিং শেষে পরিচালকের কাছে প্রডাকশন বাবদ পাওনা হই ১৪,১৬,৬৩০ টাকা। এরমধ্যে সাবেক বকেয়া ৯৪,০০০ ও ১৫,০০০; প্রেম পদ্য, গল্পটা সামান্যই, দুই দিনের দুনিয়া এই তিনটি নাটকের বকেয়া ৩,৯৪,০০০। লটারি নাটকে পাওনা ৯৫,৯৫৫। তোমার প্রেমে নাটকে ৯০,২৬০। ফিদা নাটকে পাওনা ছিল ৭,২৭,৬৩০ টাকা। এই পাওনা টাকাগুলো ৩০ মে দেওয়ার কথা ছিল।’

আহত অবস্থায় দিনার। ছবি: ভিডিও থেকে স্ক্রিনশট

অভিযোগপত্রে দিনার জানান যে, মগবাজারে তাঁকে মারধর করে মোটরসাইকেলের ড্রাইভিং লাইসেন্স ছিনিয়ে নেন আনুশ। এমনকি জোরপূর্বক তাঁর কাছ থেকে ভিডিও স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়। 

লিখিত অভিযোগে দিনার বলেন, ‘আমি রাত ৮টার সময় মগবাজার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সামনে যাই। তারপর আমাকে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নিকটে একটি ক্লাবে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী পরবর্তী শুটিং প্ল্যানের কথা বলে রুবেল আনুশের নেতৃত্বে তার দলবল আমাকে জিম্মি করে। রাত ৮টা থেকে ভোর ৩টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন চালায়। বলে যে, এই মুহূর্তে তুমি ২০ লাখ টাকা আনাও, তারপর চলে যাও। কিন্তু শেষমেশ আমরা যে পাওনাদি তার কাছে পাব, সেই টাকা আর চাইতে পারব না, আগামী মাসে নগদ ৫ লাখ টাকা তাদেরকে দিব, বিনিময়ে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া মোটর সাইকেলের কাগজপত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স ফেরত পাব, এই মর্মে আমার কাছ থেকে জোরপূর্বক ভিডিও জবানবনন্দি রেকর্ড করে। এরপর ভয়ভীতি প্রদর্শন করে আমাকে রাত ৩টা ৪৫ মিনিটের দিকে ছেড়ে দেয়।’

এরপর চিকিৎসা নিতে উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে যান দিনার। এ বিষয়ে ওই অভিযোগপত্রে তিনি বলেন, ‘সেখান থেকে বের হয়ে দ্রুত উত্তরার ইবনেসিনা হাসপাতালে যাই। তখন কর্তব্যরত ডাক্তার জানায় যে আমার ডান পাশের কানের পর্দা ফেটে গেছে।’

গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে প্রোডাকশন ম্যানেজার দিনারের ভাষ্য, ‘‘আমি তো কালকে (বৃহস্পতিবার) মরেই যেতাম। আমার অণ্ডকোষে লাত্থি মারছে। প্রায় আধা ঘণ্টা অজ্ঞান ছিলাম। পৌনে চারটা পর্যন্ত নির্যাতন করছে। আমি ওনাদের হাতে-পায়ে ধরে কান্নাকাটি করছি—‘ভাই এ পৃথিবীতে আমার মা-বোন ছাড়া কেউই নেই, এদেরকে দেখতে হবে।’ কাজটা তারা প্ল্যান করে করছে। আমি আগে বুঝতে পারিনি একদমই।’’

এই ঘটনার সুবিচার আশা করে দিনার বলেন, ‘এটার বিচার না হলে ওরা তো এমনটা আরও অনেকের সঙ্গে করবে। আমি কোনোভাবে জীবন নিয়ে বাঁচতে পারছি।’

অন্যদিকে, ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালের কাছে এসব অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন রুবেল আনুশ। তিনিও প্রায় ৬ লাখের মতো টাকা পান জানিয়ে বললেন, ‘আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আসছে, সেগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। দিনার যেমন আমার কাছে টাকা পায়, আমিও তার কাছে টাকা পাই প্রায় ৬ লাখের মতো।’

মগবাজারের ওই ক্লাবে মারধরের ব্যাপারে জানতে চাইলে আনুশ বললেন, ‘আমি কাউকে মারধর করিনি। আমার প্রোডাশন টিমের কয়েকজন ছিল। তারা উত্তেজিত হয়ে মারধর করেছে।’   

অন্যদিকে, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে শুক্রবার (৩১ মে) রাতে দুই পক্ষকে নিয়ে আলোচনায় বসে ডিরেক্টরস গিল্ড ও প্রোডাকশন ম্যানেজার অ্যাসোসিয়েশন। এতে উপস্থিত ছিলেন রুবেল আনুশ, দিনার, শামীমসহ আরও অনেকে। অভিযোগ রয়েছে, মিডিয়ার বাইরের লোকজন জড়ো হওয়ারও। 

অবশেষে আগামী ৮ জুন দুই পক্ষকে কাগজপত্র দেখানোর দিন-তারিখ ধার্য করেছে সংশ্লিষ্ট সংগঠন। ডিরেক্টরস গিল্ডের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান সাগর বলেন, ‘আমরা দুই সংগঠন আগামী ৮ তারিখ তাদেরকে হিসাব-নিকাশের কাগজপত্র দেখাতে বলছি। কারণ, আদ্যপান্ত না জেনে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব না। চেষ্টা করব বিষয়টি যেন মিটমাট হয়ে যায়।’