শ্রুতিনাটক থেকে মঞ্চের ‘গ্যালিলিও’

বর্ণাঢ্য জীবনে মঞ্চ, রেডিও, টেলিভিশন ও সিনেমা—তাঁর প্রতিভার উজ্জ্বল সাক্ষী হয়েছে পাঁচ দশক। তিনি ঢাকার মঞ্চে ‘গ্যালিলিও’ কিংবা ‘নূরুলদীন’, আবার নব্বই দশকের টিভি পর্দায় প্রিয় ‘বড় চাচা’। বিজ্ঞাপন জগতেও অবদান রয়েছে তাঁর। অবদান রয়েছে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেও। ছিলেন একজন সফল সংগঠক। সব মিলিয়েই, তিনি একজন আলী যাকের।

আজ এই বরেণ্য অভিনেতার মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর চিরঘুমের দেশে পাড়ি দেন তিনি।

বাংলাদেশে টিকিট কেটে মঞ্চনাটক দেখার প্রচলন হয়েছিল আলী যাকেরের হাত ধরেই। তবে পুরাদস্তুর অভিনেতা হিসেবে মঞ্চযাত্রা শুরুর আগে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। অনার্স শেষে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানের করাচিতে ব্রিটিশ এজেন্সি ডন ক্রফোর্ডসে ট্রেইনি এক্সিকিউটিভ হিসেবে যোগ দেন তিনি। কিন্তু এই চাকরিতে বেশিদিন ছিলেন না। ১৯৬৭ সালে করাচি গিয়ে ১৯৬৯ সালে ঢাকায় ফিরলেন।

বাকী ইতিহাস নাটকের মঞ্চে আলী যাকের ও আবুল হায়াত। ছবি: সংগৃহীত

দেশে ফিরে বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিকে চাকরি করছিলেন। সারা দেশ তখন উত্তাল। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে চলে গেলেন। প্রশিক্ষণ নিলেন। কলকাতায় দেখা হলো প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা ও সাংবাদিক আলমগীর কবিরের সঙ্গে। আলী যাকেরকে তিনিই বললেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে ময়দানের যুদ্ধের মতোই জরুরি হলো প্রচারযুদ্ধ। বিশ্ববাসীকে বোঝাতে হবে আমরা ন্যায়যুদ্ধ করছি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র একটা ইংরেজি সার্ভিস শুরু করছে, লেগে যাও।’ এরপর বেতার কেন্দ্র থেকেই প্রচারণা চালিয়েছেন।

নাট্যজন মামুনুর রশীদের সঙ্গে আলী যাকেরের ছিল ‘তুই’ সম্পর্ক। তাঁদের প্রথম দেখা হয়েছিল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে। সেখানে আলী যাকের খবর পাঠের পাশাপাশি শ্রুতিনাটক করতেন। তাঁর দরাজ কণ্ঠ শুনে নাটকে অংশ নিতে বললেন মামুনুর রশীদ। 

১৯৭২ সালে নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ে যোগ দেন আলী যাকের। ছবি: সংগৃহীত

মঞ্চে আলী যাকেরের শুরুটা এভাবেই। ১৯৭২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকে প্রথম অভিনয় করেন তিনি। নির্দেশনায় ছিলেন মামুনুর রশীদ। ওই বছরের জুন মাসে নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ে যোগ দেন। দলটির জন্য আতাউর রহমানের নির্দেশনায় ‘বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ’ নাটকে প্রথম অভিনয় করেন, ওয়াপদা মিলনায়তনে যার প্রথম মঞ্চায়ন হয়েছিল। তখন থেকে নাট্যদল নাগরিকই তাঁর ঠিকানা।

১৯৭৩ সালে নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ে তিনি প্রথম নির্দেশনা দেন বাদল সরকারের ‘বাকি ইতিহাস’ নাটকটি, যা ছিল বাংলাদেশে প্রথম দর্শনীর বিনিময়ে নাট্য প্রদর্শনীর সূচনা।

ক্যারিয়ারে অসংখ্য আলোচিত মঞ্চনাটকের অভিনেতা ও নির্দেশক আলী যাকের। এর মধ্যে ‘সৎ মানুষের খোঁজে’, ‘দেওয়ান গাজীর কিস্সা’, ‘কোপেনিকের ক্যাপটেন’, ‘গ্যালিলিও’ ও ‘ম্যাকবেথ’ উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে, টেলিভিশনের পর্দায় এ অভিনেতার ‘আজ রবিবার’, ‘বহুব্রীহি’, ‘তথাপি’, ‘পাথর’, ‘দেয়াল’সহ অসংখ্য আলোচিত কাজ রয়েছে তাঁর। বিশেষ করে হুমায়ূন আহমেদের নাটকে আলী যাকের অভিনীত চরিত্রগুলো আকাশছোঁয়া জনপ্রিয়তা পায়।