বারবার নাম পরিবর্তন, যেভাবে কাজল থেকে হুমায়ূন আহমেদ

তিনি হুমায়ূন আহমেদ নামেই পরিচিত, তবে জন্মের পর প্রথম যে নামে ডাকা হতো তাঁকে, তা ছিল ‘কাজল’। বাংলা সাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিকদের একজন হুমায়ূন আহমেদের এই নামকরণ নিয়েই জড়িয়ে আছে একটি আবেগঘন পারিবারিক গল্প, যার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন তাঁর মা আয়েশা ফয়েজ নিজের স্মৃতিকথা ‘জীবন যে রকম’ বইয়ে।

শুরুটা ছিল ‘কাজল’ নাম দিয়ে

১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর জন্ম হয় হুমায়ূন আহমেদের। নবজাতকের নাম রাখা হয় ‘কাজল’। আয়েশা ফয়েজ সেই বইয়ের লেখেন, ‘বাচ্চার নাম রাখা হলো কাজল। কাজলের জন্মের খবর জানিয়ে তার বাবাকে টেলিগ্রাম করা হলো পরদিন ভোরে।’

তবে হুমায়ূনের বাবা ফয়জুর রহমান তখন কর্মস্থলে থাকায় সন্তানের জন্মের সময় তিনি উপস্থিত থাকতে পারেননি। সবার আগেই ছুটে এসেছিলেন আয়েশা ফয়েজের নানি—নিজ হাতে শিশু কাজলকে পরিচর্যা করেন।

‘আমার নানি এসে কাজলকে মানুষ করার কাজে লেগে গেলেন। প্রথমে নানা রকম গাছগাছালির পাতা ছেঁটে রস, মধু আর এক টুকরা কাঁচা হলুদ তার সাথে গরম করে ততটুকু খাইয়ে দিলেন’— লেখেন আয়েশা ফয়েজ।

নাম বদলের পেছনের গল্প

হুমায়ূন আহমেদের জন্মের পর, যখন তাঁর বাবা ফয়জুর রহমান ছুটি নিয়ে সন্তানকে দেখতে আসেন, তখন তাঁর ছেলেকে নিয়ে গর্বের শেষ ছিল না।

‘কাজলের বাবা গম্ভীর হয়ে বলল, রানীর ছেলে বিখ্যাত হবে বাবা-মায়ের নামে, আর আমার ছেলে বিখ্যাত হবে তার নিজের যোগ্যতায়! তুমি দেখে নিও।’

এখানেই শেষ নয়। পুত্রের ভাগ্য গণনা করে ফয়জুর রহমান ভবিষ্যদ্বাণী করেন—‘অনেক বিখ্যাত হবে তোমার ছেলে! জানো রানি এলিজাবেথের ছেলে আর তোমার ছেলের জন্ম একই দিনে, একই লগ্নে?’

এই বিশ্বাস থেকেই তিনি নিজের ছেলের জন্য একটি নতুন নাম খোঁজেন—একটি এমন নাম, যা সময়ের সাথে তাঁকে আলাদা পরিচিতি দেবে।

‘আমার বাবা আর শ্বশুর আমাকে সিলেটে পৌঁছে দিলেন... যাবার আগে দুজনে অনেক চিন্তাভাবনা করে কাজলের ভালো নাম রাখলেন শামসুর রহমান।’

তবে সমস্যা দাঁড়ায় অন্য জায়গায়—বাংলাদেশে ইতিমধ্যে শামসুর রাহমান নামে একজন খ্যাতিমান কবি রয়েছেন। একজন কবি শামসুর রাহমান, আরেকজন হলেন কথাশিল্পী শামসুর রহমান—এতে তো বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে!

তাই কাজলের বাবা একদিন হঠাৎ করেই তাঁর ছেলের নাম পাল্টে রাখেন ‘হুমায়ূন আহমেদ’।

‘তারা (বাবা ও শ্বশুর) চলে যাবার পর পরই কাজলের বাবা কী ভেবে তার নাম পাল্টে রাখেন হুমায়ূন আহমেদ। ভাগ্যিস রেখেছিল তা না হলে... একটি মাত্র আকার দিয়ে আলাদা করতে হতো! একজন সমকালীন শ্রেষ্ঠ কবি শামসুর রাহমান ও অন্যজন হত কথাশিল্পী শামসুর রহমান!’—বলেন আয়েশা ফয়েজ।

এভাবেই ‘কাজল’ হয়ে উঠল ‘হুমায়ূন আহমেদ’। 

শাশুড়ির আপত্তি ও ‘শামসুর মা’ নামেই ডাকা
তবে পরিবারে সবাই এই নাম সহজভাবে গ্রহণ করেননি। বিশেষ করে হুমায়ূনের দাদি, অর্থাৎ ফয়জুর রহমানের মা, কখনোই পছন্দ করতে পারেননি ‘হুমায়ূন’ নামটিকে।

বিষয়টি আয়েশা ফয়েজ তুলে ধরেন এভাবে—‘আমার শাশুড়ি কখনোই হুমায়ূন নামটাকে গ্রহণ করেননি। শেষদিন পর্যন্ত আমাকে ডেকে গেছেন শামসুর মা!’ 

প্রসঙ্গত, বাংলা কথাসাহিত্য ও নাট্যজগতের জনপ্রিয়তম লেখক হুমায়ূন আহমেদের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। 

একনজরে হুমায়ূন আহমেদ
জন্ম: ১৩ নভেম্বর ১৯৪৮
জন্মস্থান: মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনা
শৈশবের ডাকনাম: কাজল
পিতা: ফয়জুর রহমান আহমেদ (ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট, মুক্তিযুদ্ধে শহীদ)
মাতা: আয়েশা ফয়েজ
প্রথম বই: নন্দিত নরকে (১৯৭২)
মোট প্রকাশিত গ্রন্থ: প্রায় ৩০০টি
সৃষ্ট বিখ্যাত চরিত্র: হিমু, মিসির আলি, শোভন
বিশেষ অর্জন: একাধিকবার বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার ও একুশে পদক (১৯৯৪)
চলচ্চিত্র নির্মাণ: আগুনের পরশমণি, শ্রাবণ মেঘের দিন, ঘেটুপুত্র কমলা প্রভৃতি
মৃত্যু: ১৯ জুলাই ২০১২, নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র
চিরনিদ্রা: নুহাশপল্লী, গাজীপুর