ইতালির ভেনিসে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের ওপর নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হামলা, শারীরিক হেনস্তা ও অপমানের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানিয়েছে দৃশ্যমাধ্যম সমাজ। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই হামলায় জড়িতদের শনাক্ত এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ১২২ জন শিল্পী।
‘সাংস্কৃতিক ফ্যাসিবাদ রুখে দাঁড়াও’ শীর্ষক বিবৃতিতে তাঁরা বলেন, ‘একজন শিল্পীকে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, মতপ্রকাশ কিংবা গণআন্দোলনে নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়ানোর কারণে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করা শুধু নিন্দনীয় নয়, এটি মতের স্বাধীনতা, মানবাধিকার ও মানবিক মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত। মর্যাদাপূর্ণ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে বাঁধন এবং তাঁর সহশিল্পীরা যখন ইতালিতে ভ্রমণ করছে, ঠিক তখন কতিপয় আওয়ামী দুষ্কৃতিকারীদের হাতে এই হামলার ঘটনা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেছে।’
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘স্বৈরাচারবিরোধী জুলাই গণঅভুথানের উত্তাল সময়ে দেশের বহু শিল্পীর সঙ্গ আজমেরী হক বাঁধনও অন্যায়, হত্যা, দমন ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থান প্রকাশ করেছিলেন। শিল্পীর স্বাধীনতা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক মতের অনুগতের ওপর নির্ভর করে না। যে শিল্পী কথা বলার অধিকার রাখেন, তিনি একই সঙ্গে নীরব থাকারও অধিকার রাখেন; তাঁর মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করার অধিকার আমাদের আছে, কিন্তু তাঁকে অপমান, ভয় দেখানো কিংবা তাঁর শরীরে হাত তোলায় অধিকার কারও নেই।’
যোগ করে শিল্পীরা বলেন, ‘আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই, রাজনৈতিক মতের বিরোধিতা কখনও সহিংসতার লাইসেন্স হতে পারে না। একজন নারী শিল্পীর গায়ে হাত তোলা, তাঁকে প্রকাশ্যে হেনস্তা করা এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন কোনো প্রতিবাদের ভাষা নয়; এটি নিছক সহিংসতা এবং ফ্যাসিবাদী ক্ষমতার সেই পুরনো সংস্কৃতিরই পুনরাবৃত্তি, যেখানে যুক্তির বদলে শরীরকে আঘাত করা হয়, কথার বদলে ভয় দেখানো হয়।’
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেরণার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, ‘মহান মুক্তিযুদ্ধ আমাদের শিখিয়েছিল স্বাধীনতার জন্য জীবন দেওয়া যায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান আমাদের শিখিয়েছে ভয়কে অতিক্রম করে কথা বলা যায়। এমন ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার পর কোনো শিল্পীকে আবার তাঁর মতের জন্য ভয় দেখানো, হেনস্তা করা বা আক্রমণ করা আমরা মেনে নেব না। সাম্য, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়বিচারের মূলনীতিতে একাত্তর ও চব্বিশের কোনো চেতনা যদি কিছু হয়ে থাকে, তবে তা হলো মানুষের কথা বলার অধিকার, ভিন্নমতের অধিকার এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর অধিকার।’
বিবৃতিতে শিল্পীরা বলেন, ‘দৃশ্যমাধ্যম সমাজ এই হামলার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, হামলাকারীদের শনাক্তকরণ এবং আইনানুগ বিচারের দাবি জানাচ্ছে। একই সঙ্গে আমরা আজমেরী হক বাঁধনের পাশে আমাদের দৃঢ় সংহতি প্রকাশ করছি। আমরা আবারও স্পষ্ট করে বলছি—শিল্পীর শরীর কোনো রাজনৈতিক প্রতিশোধের ক্ষেত্র নয়, শিল্পীর কণ্ঠ কোনো ভয়ের কাছে জিম্মি নয়। মতের বিরুদ্ধে মত আসুক, যুক্তির বিরুদ্ধে যুক্তি আসুক; কিন্তু সহিংসতা নয়।’