সত্যজিতকে যে কবিতা দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ!

ভারতীয় সিনেমার কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়। চলচ্চিত্রে তাঁর কীর্তি আজও দীপ্তিময়। এমনকি ভবিষ্যতেও যে এমনই থাকবে, সেই নিশ্চয়তার জন্য সিনেপ্রেমীদের জ্যোতিষী হওয়ার প্রয়োজন নেই! বরং তাঁর সিনেমাগুলোর দিকে তাকালেই যথেষ্ট আঁচ পাওয়া যায়। আর ইতিহাসের পাতা উল্টালে এমন অনেক গল্প জানা যায়, যা শিহরন জাগায়। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সত্যজিত রায়ের পরিবারের ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। আজ এই মহান নির্মাতার জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক, তাঁর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সম্পর্ক কেমন ছিল? কীভাবে এই দুই প্রবাদপ্রতিম মনীষীর প্রথম আলাপ হয়েছিল?

সত্যজিতের যখন জন্ম, রবি ঠাকুরের বয়স তখন ৬০। ফলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের মধ্যে যে বন্ধুত্বপূর্ণ কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠবে না, সেটা বলাই বাহুল্য। তবুও তাঁদের মধ্যে এমন কিছু মেলবন্ধন তৈরি হয়েছিল যা পরবর্তীকালের ইতিহাস। জন্মসূত্রেও ভীষণ মিল রয়েছে দুজনের মধ্যে। দু’জনের জন্ম বৈশাখে।

ঘরে বাইরে সিনেমার একটি দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

পারিবারিক সূত্রে যোগাযোগ থাকলেও সত্যজিতের যখন ১০ বছর বয়স, তখন প্রথম রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা হয় তাঁর। শান্তিনিকেতনের পৌষমেলায়। মা সুপ্রভা রায়ের সঙ্গে কবিগুরুর আশীর্বাদ নিতে শান্তিনিকেতনে গিয়েছিলেন ছোট্ট মানিক। রবি ঠাকুরের সামনে অটোগ্রাফের খাতা বাড়িয়ে দিতেই তিনি সেটি সই না করেই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন। 

পরের দিন অটোগ্রাফের সেই খাতা সত্যজিৎকে ফিরিয়ে দেন রবীন্দ্রনাথ। খাতা হাতে পেয়েই আগ্রহ ভরে ছোট্ট সত্যজিৎ দেখতে পান সেখানে কোনো অটোগ্রাফ নয়, বরং রয়েছে আস্ত একটি কবিতা। যেখানে লেখা ছিল—‘বহুদিন ধরে বহু ক্রোশ দূরে/ বহু ব্যয় করি, বহু দেশ ঘুরে/ দেখিতে গিয়েছি পর্বতমালা/ দেখিতে গিয়েছি সিন্ধু/ দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া/ ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া/ একটি ধানের শীষের ওপর/ একটি শিশির বিন্দু।’

হ্যাঁ, ঠিক এভাবেই শুরু হয় সত্যজিৎ ও রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক। তৈরি হয় ইতিহাস। পরবর্তী সময়ে কবিগুরুর সাহিত্য ও জীবনবোধ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন সত্যজিৎ, যার দেখা মেলে চলচ্চিত্রে। এদিকে, সত্যজিতের বয়স যখন ১৬, তখন রবীন্দ্রনাথের অভিভাবকত্বে বড় হওয়ার জন্য তাঁকে ভর্তি করানো হয় শান্তিনিকেতনে। 

চারুলতা সিনেমার একটি দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

একাধিক সিনেমায় রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস ও গান ব্যবহার করেছেন সত্যজিৎ। ১৯৪৫ সালে ‌‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসের চলচ্চিত্ররূপ লিখেছিলেন নির্মাতা। কিন্তু অপটু হাতের লেখা সেই চিত্রনাট্য বাস্তবে রূপায়ন সম্ভব হয়নি। এর প্রায় ৪০ বছর পর তিনি আবার নতুন করে চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেছিলেন। ১৯৮৪ সালে ভারতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও দামাস্কাস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার পায় সিনেমাটি।

এরপর, ১৯৬৪ সালে রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প অবলম্বনে সত্যজিৎ তৈরি করেছিলেন ‘চারুলতা’, যা বিশ্ব সিনেমায় তাঁকে এনে দেয় সম্মান। বলা হয়ে থাকে, এটি সত্যজিতের তৈরি সব থেকে নিখুঁত একটি সিনেমা। এভাবেই সিনেমায়, গল্পে, গানে একাকার হয়ে আছেন কবিগুরু ও সত্যজিৎ।