সাদা পাথরের কান্না, প্রবালের সংগ্রাম: বাংলাদেশের প্রকৃতিতে সংকট ও সংকল্পের বছর

২০২৫ সাল বাংলাদেশের প্রকৃতি ও পরিবেশের ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণ। এই বছরটি একদিকে যেমন ছিল কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার সময়, অন্যদিকে কিছু নতুন নীতি আর দৃঢ় প্রতিজ্ঞার স্নিগ্ধ প্রলেপ। বনানীর গভীরতা, বন্যপ্রাণের বৈচিত্র্য, নদীর বহমান ধারা, হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি এবং উপকূল-পাহাড়—সবই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মানুষ উদ্বিগ্ন হয়েছে প্রাকৃতিক সম্পদের লুণ্ঠন দেখে, প্লাস্টিকের বিষাক্ত দূষণ আর দায়িত্বজ্ঞানহীন পর্যটনের আঘাতে। জলবায়ু পরিবর্তনের সংকট বারবার স্মরণ করিয়ে দিয়েছে প্রকৃতির কাছে আমাদের দায়বদ্ধতা। ঠিক তখনই বন্যপ্রাণী ও বন সংরক্ষণে নতুন আইনের দৃঢ় ঘোষণা এবং নীতিমালার পুনর্গঠন আগামী দিনের জন্য এক বুক আশার সঞ্চার করেছে।

সেন্টমার্টিন, আমাদের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ, বছরজুড়ে ছিল তার ভঙ্গুর অস্তিত্ব নিয়ে এক নীরব সংগ্রামের কেন্দ্রে। ২০২৫-এ পরিবেশ সংকট নিয়ে আবারও আলোচনায় এলেও এবার সরকারের উদ্যোগ ছিল তুলনামূলকভাবে সুদৃঢ় ও স্পষ্ট। দ্বীপের বাতাসকে বিষমুক্ত করতে চালানো হয়েছে বড় পরিসরের প্লাস্টিক-বর্জ্য পরিষ্কার অভিযান, যেখানে অপসারিত হয়েছে ১৪ টনেরও বেশি বিষাক্ত আবর্জনা। পর্যটকদের প্রবেশাধিকার কিউআর-কোড দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে, যাতে অতি-ভ্রমণের চাপ কমানো যায়। রাতের আঁধারে যেকোনো আগুন বা বারবিকিউ নিষিদ্ধ হয়েছে এবং সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিকের ব্যবহারও করা হয়েছে বারণ। মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ শব্দ ও জ্বালানি দূষণকারী যান চলাচলে এসেছে কঠিন নিয়ন্ত্রণ। এমনকি কচ্ছপের প্রজনন ও নিরাপত্তার জন্য দ্বীপের বেওয়ারিশ কুকুরদের জন্মনিয়ন্ত্রণ করার পরিকল্পনা শুরু হয়েছে। বছরের অনেকটা সময় এই প্রবালভূমি পর্যটকদের জন্য বন্ধ থাকার পর যখন আবার ভ্রমণের অনুমতি মিলেছে, তা ছিল কঠোর নির্দেশনার জালে আবদ্ধ।

সেন্টমার্টিনের পরিবেশ সংরক্ষণে বছরের বেশিরভাগ সময় পর্যটকদের চলাচল সীমিত করা হয়। ফাইল ছবি

অন্যদিকে প্রকৃতির আরেক অঙ্গনে ধ্বনিত হয়েছে লুটেরাদের উল্লাস—সিলেটের সাদা পাথর লুট। ভোলাগঞ্জ ও জাফলং-এ আদালতের স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও অনিয়ন্ত্রিত পাথর উত্তোলন চলেছে বছরের পর বছর। ধলাই নদের উৎসমুখ, কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর ও সংরক্ষিত টিলাগুলো থেকে গণহারে পাথর সাবাড় হয়েছে। এই অবৈধ উত্তোলন নদীর বাঁধ ও তীরকে করেছে ক্ষয়িষ্ণু; যা শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই নয়, বরং বাস্তুসংস্থান, মাটি ও জলের প্রবাহকে ফেলেছে মারাত্মক ঝুঁকিতে। সরকারি পর্যায়ে অভিযান চললেও দুর্বল আইন প্রয়োগের কারণে এই লুণ্ঠন পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

সিলেটের পর্যটন এলাকায় সাদা পাথর লুট করে দুর্বৃত্তরা। ফাইল ছবি

এই বছর নগরের আকাশ ছিল বিষণ্ন, দূষণের কালো চাদরে ঢাকা। রাজধানী ঢাকা যেন ধোঁয়াশার এক কারাগার। বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যার মতো নদীগুলো পরিণত হয়েছিল বর্জ্যের আখড়ায়। দূষণের প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে প্লাস্টিক, শিল্প-কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য এবং অগোছালো পর্যটন। রাতারগুলের মতো জীববৈচিত্র্যপূর্ণ বনেও পর্যটকের ভার ও অবৈধ জালের কারণে বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে।

এই ঘোর সংকটের মাঝেও সরকার পরিবেশ সুরক্ষার জন্য কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়। ২০২৫ সালে ‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ’ এবং ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়। এই আইনগুলোতে বন উজাড় ও বন্যপ্রাণী হত্যার শাস্তি কঠোর করা হয়েছে। পাশাপাশি ‘শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা, ২০২৫’ প্রণয়ন ছিল একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন থাকা আর তার বাস্তবায়ন হওয়া ভিন্ন বিষয়; ২০২৫ সাল সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।

বায়ু দূষণ। ফাইল ছবি

সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল ছিল সংকট ও সম্ভাবনার এক মিশ্র বছর। ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, জনস্বাস্থ্য ও টিকে থাকার জন্য বন, নদী ও সমুদ্রকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। ভবিষ্যতের বীজ বোনা হয়েছে—এখন দরকার তাকে লালন করার সংকল্প।