বন ও বৃক্ষ নিধনের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে জারি করা হয়েছে ‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ অধ্যাদেশ, ২০২৬’। মঙ্গলবার আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়। ছয়টি অধ্যায়ে প্রকাশিত এই অধ্যাদেশে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব ও কর্তব্য, বনভূমি ব্যবস্থাপনা, বৃক্ষ ব্যবস্থাপনা, অপরাধ ও দণ্ড এবং বিবিধ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী, বাণিজ্যিক উৎপাদনের উদ্দেশ্য ছাড়া অন্য কোনো কারণে গাছে পেরেক বা কোনো ধাতব বস্তু ব্যবহার করে ক্ষতিসাধন করা যাবে না। এ বিধান অমান্য করলে আদালত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারবেন। আর অবৈধভাবে গাছ কাটার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, বন সংরক্ষণ কর্মকর্তার পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে ‘বন আইন, ১৯২৭’-এর ৪ ও ৬ ধারার আওতাভুক্ত গেজেটভুক্ত বন, অশ্রেণিভুক্ত রাষ্ট্রীয় বন, সামাজিক বন এবং সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন গণপরিসরের গাছ কর্তন বা অপসারণ করা যাবে।
অধ্যাদেশ বাস্তবায়নে প্রধান বন সংরক্ষক বিভাগীয় বন কর্মকর্তাদের বৃক্ষ সংরক্ষণ কর্মকর্তার দায়িত্ব প্রদান করবেন। গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নিষিদ্ধ ঘোষিত অথবা বন অধিদপ্তর কর্তৃক বিপদাপন্ন হিসেবে চিহ্নিত কোনো গাছ কাটা যাবে না।
তবে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমিতে অবস্থিত কর্তনযোগ্য গাছ নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে কাটার অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে আবেদনকারীকে গাছের প্রজাতি, সংখ্যা, আনুমানিক উচ্চতা, বুক সমান উচ্চতায় বেড়ের পরিমাপ এবং কর্তনের কারণ উল্লেখ করে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে। আবেদন যাচাই ও সরেজমিন পরিদর্শনের পর ৩০ দিনের মধ্যে লিখিত সিদ্ধান্ত দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে।
অধ্যাদেশে অবৈধভাবে গাছ কাটার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
অধ্যাদেশ লঙ্ঘনে শাস্তির বিধান
কর্তন নিষিদ্ধ গাছ কাটলে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা জরিমানা ও ক্ষতিপূরণমূলক বনায়নের নির্দেশ দিতে পারবেন আদালত। অনুমতি সাপেক্ষে কর্তনযোগ্য গাছের বিধান লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা এবং গাছের ক্ষতিসাধনের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
সরকারি বা বেসরকারি কোনো সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত হলে সংশ্লিষ্ট পরিচালক, কর্মকর্তা বা প্রতিনিধিকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করে সর্বোচ্চ তিন লাখ টাকা জরিমানার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ক্ষমতাপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তাদের মামলা দায়ের, তদন্ত, তল্লাশি, জব্দ এবং আদালতে বন অধিদপ্তরের পক্ষে মামলা পরিচালনার ক্ষমতাও নির্ধারণ করা হয়েছে।
বনভূমির জরিপ ও রেকর্ড সংক্রান্ত বিধান
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, বৃক্ষাচ্ছাদন থাকুক বা না থাকুক—গেজেট দ্বারা ঘোষিত সব বনভূমি বন বিভাগের নামে রেকর্ডভুক্ত করতে হবে। রক্ষিত ও অর্জিত বনভূমি জেলা প্রশাসকের নামে রেকর্ডভুক্ত থাকবে এবং এসব বনভূমি বন বিভাগের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হবে।
বন বিভাগের ব্যবস্থাপনাধীন রক্ষিত, অর্পিত ও অর্জিত কোনো বনভূমি বন্দোবস্ত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। তবে বিধি অনুযায়ী কোনো বনভূমি অবমুক্ত করা হলে এসব বিধান প্রযোজ্য হবে না।
অধ্যাদেশ কার্যকর হওয়ার পর বন অধিদপ্তরকে ভূমি রেকর্ড ও জরিপ অধিদপ্তরের মাধ্যমে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বনভূমির জরিপ, সীমানা নির্ধারণ ও রেকর্ড হালনাগাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যেসব দাগে বন বিভাগের আংশিক ভূমি রয়েছে অথবা বনভূমির সঙ্গে সংলগ্ন খাস জমি রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে বন্দোবস্ত দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট বন বিভাগকে অবহিত করতে হবে। পরে যৌথ জরিপের মাধ্যমে সীমানা নির্ধারণ করতে হবে।
এ ছাড়া বনের অখণ্ডতা রক্ষায় বনাঞ্চলের ভেতরে থাকা খাস জমি বন বিভাগের অনুকূলে হস্তান্তর এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণ করে বন হিসেবে ঘোষণার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় ভূমিসহ ঐতিহ্য ও প্রথাগত বন অধিকারের নিষ্পত্তির শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
শর্তসাপেক্ষে বনভূমি বিনিময়
কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থা বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন জমির ভেতরে বিচ্ছিন্নভাবে এক একরের কম বনভূমি থাকলে অপরিহার্যতা ও জনস্বার্থ বিবেচনায় বিধিমালায় নির্ধারিত পদ্ধতিতে সরকারপ্রধানের অনুমোদনে বিনিময়ের অনুমতি দেওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে ওই বনভূমির পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট বনসংলগ্ন দ্বিগুণ নিষ্কণ্টক জমি বন বিভাগকে হস্তান্তর করতে হবে এবং তা সরকারি গেজেটের মাধ্যমে সংরক্ষিত বনভূমি হিসেবে ঘোষণা করা হবে।