শিকারীদের ফাঁদে আটকে পড়া সেই বাঘিনীকে উদ্ধারের ৬ মাস পর সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হয়েছে। এই ফেরা সুন্দরবনের জীববৈচিত্র সংরক্ষণ ও বন্যপ্রাণি সংরক্ষণের ইতিহাসে স্মরণীয় দিন হিসেবে লেখা থাকবে বলে মনে করছে বন বিভাগ।
বন বিভাগ জানায়, গত ৪ জানুয়ারি মোংলার সুন্দরবনের বৈদ্যমারী ফরেস্ট ক্যাম্প সংলগ্ন শড়কির খাল এলাকা থেকে বাঘটি উদ্ধার করা হয়েছিল। উদ্ধারের ৪/৫ দিন আগে চোরা শিকারীদের পাতা ফাঁদে আটকে ছিল বাঘিনীটি। ফাঁদে আটকে পড়ায় বাঘটির সামনের বাম পায়ে মারাত্মক ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছিল। এতে বাঘটি অসুস্থ ও দুর্বল হয়ে পড়ে। পরে ঢাকা থেকে বনবিভাগের বিশেষজ্ঞ দল এসে বাঘটিকে অচেতন করে উদ্ধারের পর খুলনায় নিয়ে যায়। খুলনায় বনবিভাগের বন্যপ্রাণী উদ্ধার কেন্দ্রে ৬ মাস রেখে বাঘটিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘বন্যরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে। বনের প্রাণিকে বনেই মানাবে। সে সুন্দরবনের আবাসস্থলে ফিরে গেছে। গত ছয় মাস ধরে বনবিভাগ আহত বাঘটিকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ্য করে তুলেছে। বাঘটি আবার বনে ফিরে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবে কিনা তার জন্য তারা নিবিড় পর্যবেক্ষণ করেছে। যখন তাদের মনে হয়েছে বাঘটি এখন বনে ফিরতে পারবে তখনই তাকে তার আবাসস্থলে ছেড়ে দেওয়া হলো। বাঘের চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে আবার বনে অবমুক্ত করার ঘটনা এটিই প্রথম। যা ইতিহাস হয়ে থাকবে।’
প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমির হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘সুন্দরবনের জীববৈচিত্র সংরক্ষণ এবং বন্যপ্রাণি সংরক্ষণের জন্য আজকের দিনটি সুন্দরবনের ইতিহাসে স্মরণীয় দিন হিসাবে লেখা থাকবে। সুন্দরবনে বর্তমানে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি। একটা সময় সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় যারা বসবাস করতো তাদের সঙ্গে বাঘের একটা সার্বক্ষণিক দ্বন্দ্ব থাকতো। লোকালয়ে প্রবেশ করলে মানুষ বাঘ পিটিয়ে মেরে ফেলতো। সেই সমস্যা কিন্তু এখন অনেকটাই কমে গেছে। মানুষের সাথে বন্যপ্রাণির দ্বন্দ্বটি যাতে কমে সেজন্য ভিলেজ টাইগার রেন্সপন্স টিম (ভিটিআরটি) করেছি। এখন তা অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। বনের ৩৫ কিলোমিটার রশি দিয়ে ফেন্সিং করেছি। যাতে বনের বাঘ লোকালয়ে আসতে না পারে।’
প্রধান বন সংরক্ষক আরও বলেন, ‘আজকে যে বাঘটিকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হলো সেটি গত জানুয়ারি মাসে চোরা হরিণ শিকারিদের জালে ধরা পড়েছিল। তাতে এই বাঘটির পা মারাত্নকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়। দীর্ঘ ছয় মাস মেডিকেল টিম এই বাঘটিকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ করে তোলে। তাই বাঘের এই আবাসস্থলে তাকে ছাড়তে পারলাম। আগে বনবিভাগের কর্মীরা নৌকাতে করে পেট্রোল ডিউটি করতো, আমরা এখন তাতে পরিবর্তন এনেছি, বনকর্মীরাদের এখন পায়ে হেঁটে ডিউটি করার জন্য উদ্বুদ্ধ করছি। তারা বনের ভেতরে কীভাবে কত সময় ডিউটি করছে তা মনিটরিং করা হচ্ছে। পায়ে হেঁটে ডিউটি করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই পায়ে হেঁটে ডিউটি করার কারণে বনের ভেতরে চোরা হরিণ শিকারিদের ফাঁদ শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তাই বনকে চোরা শিকারীদের প্রতিরোধ করতে বনকর্মীদের আরও সজাগ ও সতর্ক থাকবে।’
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, ‘বাঘটিকে যে এলাকায় অবমুক্ত করা হয়েছে, শনিবার সেই এলাকায় ১৯টি এবং যেখান থেকে বাঘটিকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল সেখানে ১টি ইনফ্রারেড ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। বনের ২০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এ ক্যামেরা বসানোর উদ্দেশ্য হলো বাঘটির গতিবিধির ভিডিও এবং ছবি ধারণ করা। মুলত ওই এলাকায় বাঘটির বিচরণ ক্ষেত্র পর্যবেক্ষণে বসানো হয়েছে আধুনিক এ ক্যামেরা। এ ক্যামেরায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রথম ১০ সেকেন্ড ভিডিও এবং পরের ১০ সেকেন্ড স্থির চিত্র ধারণ হবে।’
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘একটি বাঘ সাধারণ বনের অভ্যন্তরের ৩০/৪০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিচরণ করে থাকে। তাই এই বাঘটি পূর্বের এলাকায় ফিরে আসে কিনা সেটিও পর্যবেক্ষণে সেখানে একটি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। বাঘিনীটি যেখান থেকে উদ্ধার হয়েছিল সেখান থেকে অন্তত ২০/২৫ কিলোমিটার দূরের বনে ছাড়া হয়েছে। এ বাঘিনীটি বয়স ৯/১০ বছর, লম্বা প্রায় ৮ ফুট। এই প্রথম আহত কোনো বাঘকে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করে পুনরায় বনে ছেড়ে দেয়া হলো।’