বিশ্বের ৩৫টি ভয়ঙ্কর মৌসুমী ঘূর্ণিঝড়ের ২৬টিই হয়েছে বঙ্গোপসাগরে। বর্ষার আগে সাগরে তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি বাড়ে। যে কারণে তৈরি হয় প্রচুর জলীয় বাষ্প। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এতে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়। একশো বছরে এপ্রিল-মে মাসে ৬৫ ঘূর্ণিঝড় হয়েছে। আর এক যুগে ১১টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হেনেছে। এর ৮টিই মে মাসে।
মে হয়ে উঠেছে ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডবের মাস। ২০২০ সালে আম্ফানের দাপটে ছিন্নভিন্ন হয় খুলনা বিভাগের উপকূলীয় জনপদ। তার ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই ২০২১ সালে হাজির হয় ঘূর্ণিঝড় ইয়াস। গত বছর আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় অশনি। এবারও মে মাসে তার ব্যাতিক্রম ঘটেনি। একশ বছরে এপ্রিল মে মাসে দেশে আঘাত হেনেছে ৬৫ ঘূর্ণিঝড়।
উরিরচর নামের একটি ঘূর্ণিঘড় হয় ১৯৮৫ সালে। ২৪ এবং ২৫ মে তাণ্ডব চালায় চট্টগ্রাম উপকূলে। প্রাণ হারান ১১ হাজার মানুষ।
১৯৯৭ সালের ১৯ মে মাসে প্রলয়ঙ্কারী ঘূর্ণিঝড় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী এবং ভোলা উপকূলে আঘাত হানে। ঘণ্টায় ২৩২ কিলোমিটার বেগে বাতাসের সঙ্গে ১৫ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয় উপকূলীয় এলাকা ৷
২০০৯ সালের ২৫ মে: ঘূর্ণিঝড় আইলার আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয় দক্ষিণ-পশ্চিমের ১৫ জেলা। এ ঝড়ে ভারতে ১৪৯ জন ও বাংলাদেশে ১৯৩ জন মারা যায়। উপকূলের প্রায় ৩ লাখ মানুষ বাস্তুভিটা হারায়।
ঘূর্ণিঝড় মহাসেন ২০১৩ সালের ১৬ মে নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম উপকূলে আঘাত হানে। এটির বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার।
রোয়ানু একটি ছোট ঘূর্ণিঝড় ছিল, যা ২০১৬ সালের ২১ মে বাংলাদেশের উপকূল ও ভারতের কিছু এলাকায় আঘাত হানে। ঘূর্ণিঝড় রোয়ানুর ব্যাপ্তি ছিল দুটি বাংলাদেশের সমান আকৃতির। এর আঘাতে চট্টগ্রামে ২৪ জনের মৃত্যু হয়।
২০১৭ সালের ৩০ মে কক্সবাজার উপকূলে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় মোরা। ঝড়ের তাণ্ডবে হাজার হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়। কক্সবাজারে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জমির ফসল এবং লবণ চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
২০১৯ সালের ৩ মে ঘূর্ণিঝড় ফণী ভারতের ওড়িশা উপকূলে তাণ্ডব চালিয়ে বাংলাদেশে ছোবল দেয়, কেড়ে নেয় অন্তত ৯ জনের প্রাণ। প্রাণহানি কম হলেও ঘূর্ণিঝড় ফণীর কারণে ঘরবাড়ি, বাঁধ, সড়ক ও কৃষিতে প্রায় ৫৩৭ কোটি টাকার ক্ষতি হয়।
২০২০ সালে করোনা মহামারীর মধ্যে আঘাত হানে সুপার সাইক্লোন আম্পান। ২১মে এই অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় প্রবেশ করে বাংলাদেশে; আট জেলায় মারা যায় অন্তত ১৫ জন।
ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’ ২০২১ সালের ২৬ মে ভারতের ওড়িশা উপকূল অতিক্রম করে। এর প্রভাবে বাংলাদেশ উপকূলে কোথাও কোথাও স্বাভাবিকের চেয়ে ৭ থেকে ৮ ফুট বেশি জোয়ারে প্লাবিত হয়। উপকূলীয় ৯টি জেলার ২৭ উপজেলায় ক্ষয়ক্ষতি হয় ।
২০২২ সালের ৯ মে ঘূর্ণিঝড় আসানি অন্ধ্র উপকূলে দুর্বল হয়ে পড়ে। এসময় বাংলাদেশেও বেশ বৃষ্টি হয়।
ফিরে তাকালে দেখা যায় ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল ২২৫ মাইল বেগে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে চট্টগ্রাম উপকূলে। তৈরি হয় ১৫ থেকে ২০ ফুট জলোচ্ছ্বাস। সে ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যু হয় ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের।
বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ে বাংলাদেশে লাখ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে নানা সময়ে, বিপুল ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছেন ঊপকূলীয় এলাকার বাসিন্দারা। তবে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ঝড়ে প্রাণহানি কমেছে।