সন্তান জন্মের পর বাবাদেরও কি বিষণ্ণতায় ভুগতে হয়?

সন্তান জন্মদান কিন্তু শুধু মায়ের জীবনের একক ঘটনা নয়। বাবাও এর অংশীদার। মনে রাখতে হবে নতুন বাবারও পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশন হতে পারে। জার্নাল অব আমেরিকান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের মতে, গড়ে ১০% বাবা সন্তান জন্মের আগে বা পরে বিষণ্নতায় ভুগতে পারেন। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের উপাত্ত অনুসারে গড়ে ৪ জন বাবার মধ্যে একজন সন্তান জন্মের ৩ থেকে ৬ মাসে পোস্ট পার্টাম ব্লু'তে ভোগেন। 

এ ছাড়া বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায়, সন্তান জন্মদানের পর হরমোনের পরিবর্তনের কারণে নতুন মায়ের মতো নতুন বাবাও বিষণ্নতায় আক্রান্ত হতে পারেন। হরমোনজনিত কারণ ছাড়াও দাম্পত্য জীবনে সন্তান মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হওয়ায় নতুন বাবার নিজেকে পরিত্যক্ত বোধ করা, বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ, সন্তানের জন্য পর্যাপ্ত কাজ করতে পারছি না বলে নিজেকে দোষারোপ করার প্রবণতা, দাম্পত্য জীবনে নিজেদের মধ্যে সময় কমে যাওয়া, যৌন জীবনে অতৃপ্তি ইত্যাদিও ভূমিকা পালন করে।

এখানে বলে রাখা ভালো, বিশ্বব্যাপী পুরুষদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন সাংঘাতিকভাবে অবহেলিত। কাজেই একজন নতুন বাবার বিষণ্নতা, ক্লান্তি, অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা, অরুচি, ঘুমের সমস্যা ইত্যাদি উপসর্গকে ক্ষেত্র বিশেষে ধর্তব্যের মধ্যে আনাই হয় না। আর আমাদের সমাজ পুরুষের রাগ দেখতে যতটা অভ্যস্ত, তার দুঃখ বা ভয় দেখতে ততটা অভ্যস্ত নয়। বরং একে হাস্যকর বলে উড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়।  

সব বাবা কি ভুগবেন?
সব বাবা ভুগবেন না। যে বাবা অপেক্ষাকৃত তরুণ, যাদের বিষণ্নতার ইতিহাস আছে, আন্তঃসম্পর্কের টানাপোড়নের অভিজ্ঞতা আছে, অর্থনৈতিকভাবে টানাটানির মধ্যে যাচ্ছেন, তাদের আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। এবং এ ক্ষেত্রে বাবাদের মানসিক স্বাস্থ্যের যত্নের প্রয়োজন হয়। 

বাবার ক্ষেত্রে পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশনের লক্ষণসমূহ:
১. হতাশ, দুঃখ, ভয়, অসহায়ত্ব
২. বিভ্রান্তি, সিদ্ধান্তহীনতা
৩. পরিবার ও বন্ধুদের থেকে নিজেকে গুটিয়ে ফেলা বা দূরত্ব সৃষ্টি হওয়া
৪. রাগ, খিটখিটে মেজাজ, ক্ষোভ
৫. পছন্দের কাজে আগ্রহ কমে যাওয়া
৬. সব সময় কাজ করা
৭. দাম্পত্য কলহ
৮. অনিদ্রা
৯. মদ ও মাদকের ব্যবহার
১০. বদহজম, ক্ষুধা ও ওজন পরিবর্তন, মাথা ব্যথা ও বমি বমি ভাব

পোস্ট পার্টাম ডিপ্রেশনের চিকিৎসা
সাইকোথেরাপি: চমৎকার কাজে লাগে, এখানে কথা বলাকে চিকিৎসার কাজে লাগানো হয়।
ওষুধ: চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবেন।
নিজের যত্ন: সুষম, খাদ্য, ব্যায়াম, বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন। নিজের অনুভূতিগুলা এমন কাউকে বলা, যে আপনাকে বুঝতে পারে। 
নতুন মা যদি বিষণ্নতায় ভোগেন তাহলে কিন্তু বাবারও বিষণ্নতায় ভোগার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কাজেই এই সময় বৃহত্তর পরিবারের ভূমিকা হবে নতুন মাকে বিশ্রাম দেওয়া, সেই সঙ্গে বাবারও যত্ন নেওয়া। 

কতদিন চিকিৎসা চলবে?
সময় লাগবে। খুব অল্প কয়েকদিনেই ম্যাজিকাল কিছু আশা করা ঠিক হবে না। কারণ পর্যাপ্ত সময় নিয়ে চিকিৎসা করা না হলে, এই বিষণ্নতা দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে বা পুনরায় ফিরে আসতে পারে। আশার কথা হলো, তাড়াহুড়ো না করে সময় মতো চিকিৎসা করলে চমৎকার ফল আসে।

লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সিলর এবং সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার