যে ডিসঅর্ডারে ভুগলে শিশুরা অপরিচিত কাউকেই ভয় পায় না!

ডিসইনহিবিটেড সোশ্যাল এনগেজমেন্ট ডিসঅর্ডার (ডিএসইডি) হল একটি ডিসঅর্ডার, যেখানে একটি শিশু অপরিচিত প্রাপ্তবয়স্কদের ভয় পায় না। যেসব শিশু ডিসইনহিবিটেড সোশ্যাল এনগেজমেন্ট ডিসঅর্ডারে ভুগছে, তারা অপরিচিত কাউকে দেখলে মোটেও ভয় পায় না। বরং তারা অপরিচিতদের সঙ্গে এত বেশি গলে যায় যে, তাদের গাড়িতে উঠতে অথবা তাদের বাসায় যেতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। এই অতিমাত্রায় বন্ধুত্বপরায়ণতা সাংঘাতিক নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলে, যদি এই ডিসঅর্ডারের সঠিকমতো চিকিৎসা করা না হয়। 

লক্ষণ কী?
১. অপরিচিতদের সঙ্গে অতিরিক্ত শারীরিক ও মানসিকভাবে মিশে যাওয়া।
২. কোথাও গেলে বাসায় বলে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ না করা।
৩. সামাজিক সীমারেখাগুলো না মানা।
৪. অপরিচিতদের সঙ্গে মিশতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা–দ্বন্দ্ব বা অস্বস্তিবোধ না করা।
৫. অপরিচিতদের সঙ্গে স্বেচ্ছায় খুশি মনে চলে যাওয়া।

ধরুন, শিশুকে নিয়ে মা পার্কে গেছেন। হঠাৎ শিশুটি খেলতে গিয়ে পড়ে গেল। সাধারণত এ ক্ষেত্রে শিশুরা এই পড়ে যাওয়াটা মায়ের কাছে গিয়ে বলবে। কিন্তু ডিসইনহিবিটেড সোশ্যাল এনগেজমেন্ট ডিসঅর্ডারতে আক্রান্ত শিশুটি অপরিচিত কারো কাছে কিছু বলা শ্রেয় মনে করবে। এমনকি প্রয়োজনে ইমোশনাল সাপোর্ট খুঁজতে অপরিচিতের কোলে বসে কাঁদবে। বড়রা অবাক হতে পারেন যে, কেন অপরিচিত কারো সঙ্গে তার সন্তান এতটা মিশছে?

এতে সমস্যা কী হতে পারে?
মুশকিল হলো শিশুটি বুঝতে পারে না, কোন মানুষটি তার জন্য ক্ষতিকারক। গবেষণায় দেখা যায়, শিশুরা প্রাথমিকভাবে মানুষের চেহারা দেখে ধারণা করে, সে মানুষ বিশ্বস্ত কিংবা অবিশ্বস্ত কিনা।

চেহারা দেখে যে আসলে বোঝা যায় না, সেটা আমরা সবাই জানি। ফলে শিশুর ধোঁকা খাওয়ার আশঙ্কা তীব্র থাকে। এই ধরনের শিশুরা অনেক সময় মুখের চেহারাও মনে রাখতে পারে না। গবেষণা বলছে, ব্রেইন ইমেজিং করে দেখা গেছে এই ডিসঅর্ডারে যেই শিশুরা ভুগছে, তারা মুখ দেখে বুঝতে পারেনা, কোন মানুষটি দয়ালু ও নিরাপদ আর কোন মানুষটি নীচু মানসিকতার ও অবিশ্বস্ত।

এই শিশুরা কেন এমন করছে?
এই শিশুগুলো সাংঘাতিকভাবে মমতা খোঁজে। যেটা তারা মৌখিকভাবে ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না। ফলে ‘যে, যখন, যেভাবে’ তাদের মনোযোগ দেয়, তাতেই তারা হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে গলে জল হয়ে যায়।

দেখা যায়, অনেকেই একসঙ্গে পিকনিক গেছে, সেখানে অপরিচিতদের ভিড়ে এই শিশুরা সাবলীল ভঙ্গিতে গল্প করতে বসে গেছে। অথবা অচেনা কাউকে দিব্যি জড়িয়ে ধরেছে। দুশ্চিন্তার কথা এই শিশুরা অসম্ভবভাবে স্পর্শ পছন্দ করে। আবার দেখা যায়, চিকিৎসকের চেম্বারে বাইরে অপেক্ষা করা অপরিচিতর কোলে দেখা যায় চট করে উঠে বসে গেছে। মুশকিলটা হয় কৈশোরে। বিশেষ করে কন্যা শিশুরা যারা যৌননিগ্রহের শিকার হয়।

কিছুদিন আগে কড়াইল বস্তির এক মায়ের কাছ থেকে শুনেছিলাম, তিনি তাঁর কিশোরী কন্যাকে যৌননিরোধ ইনজেকশন দেওয়া যায় কিনা, সে বিষয়ে চিকিৎসকের কাছে প্রস্তাব দেন। কারণ মা অস্থায়ী গৃহকর্মী। সারাদিন বাইরে বাইরে কেটে যায়। বস্তির যাকেই দেখে কিশোরী তাকেই জড়িয়ে ধরে। একজন মা কতটুকু অসহায় হলে এই ধরনের কথা বলতে পারেন?

লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সিলর, সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার