ডিসইনহিবিটেড সোশ্যাল এনগেজমেন্ট ডিসঅর্ডারে (ডিএসইডি) যেসব শিশু ভুগছে, তারা অপরিচিত কাউকে দেখলে মোটেও ভয় পায় না। বরং তারা অপরিচিতদের গাড়িতে উঠতে অথবা তাদের বাসায় যেতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। সাধারণত শিশুর বেড়ে ওঠার ধাপে ধাপে ডিসইনহিবিটেড সোশ্যাল এনগেজমেন্ট ডিসঅর্ডার এ আচরণগুলি বদলায়। এবং আচরণগুলো নতুনভাবে প্রকাশিত হয় ভিন্ন মাত্রায়।
কখন এই আচরণগুলো দৃষ্টিগোচর হয়?
বয়সের ধাপ গুলি নিম্নরূপ
টডলার: সাধারণত জন্ম থেকে এক বছর পর্যন্ত সময়কে ইনফ্যান্ট বলে। তারপরে টডলার বলে। ১ বছরের ওপরে কিন্তু ৩ বছরের নিচে। এদের কাউকে কাউকে দেখা যাবে, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কোনো ভয় ছাড়াই হ্যান্ডশেক করছে। সদ্য পরিচিতের হাত ধরে ঘুরতে যাচ্ছে, কোলে উঠে বসছে ইত্যাদি। এদের ক্ষেত্রে অনেক সময় মা বলে থাকেন, ‘আমার সন্তান কাউকে ভয় পায় না।’
প্রিস্কুল: ৩ থেকে ৫ বছর। এরা অন্যের মনোযোগ আকর্ষণ করতে ব্যস্ত থাকবে। খেলার মাঠে জোরে জোরে চিৎকার করা, নিজেকে মনোযোগের বিষয়বস্তু হিসেবে উপস্থাপন করার মতো আচরণ করবে।
স্কুল সময়: ৬ থেকে ১২ বছর। এই সময় এদের মৌখিক ও শারীরিকভাবে অপরিচিতের সঙ্গে বেশি মিশে যাওয়ার প্রবণতা এবং অতিরিক্ত খাতির করার চেষ্টা নজরে আসবে। বেশি বেশি বন্ধু করার উৎসাহ পরিলক্ষিত হবে। হাসি বা কান্না দিয়ে অন্যদেরকে ম্যানিপুলেট করার প্রচেষ্টা থাকবে। প্রথম দেখাতেই জন্মের বন্ধু পাতিয়ে ফেলবে। বাড়ি নিয়ে যাবে অথবা যেতে চাইবে।
টিন এজ: এই সময় সবার সঙ্গে ঝগড়া হবে। বাবা-মা, বন্ধু, শিক্ষক কেউ বাদ যাবেন না। উপরে উপরে একটা খাতির থাকলেও ভেতরে ভেতরে দ্বন্দ্ব চলবেই।
রোগ নির্ণয়: আগে এটি আরেক ধরনের অ্যাটাচমেন্ট ডিসঅর্ডারের অধীনে বিবেচিত হতো। তখন এর নাম ছিল রিএ্যায়াক্টিভ অ্যাটাচমেন্ট ডিসঅর্ডার, কিন্তু বর্তমানে DSM-V এ একে আলাদা করা হয়েছে।
এ ক্ষেত্রে কয়েকটি আচরণ পরিলক্ষিত হবে। যেমন:
১. মৌখিক বা শারীরিকভাবে বেশি গলে পরা বা মাখামাখি করা, যেটা তার দেশজ সংস্কৃতি, সামাজিকতা অনুমতি দেয় না।
২. অপরিচিতের সঙ্গে মিশতে অসংযমী।
৩. অপরিচিতদের সঙ্গে বাইরে যেতে উদ্যোগ নিলে বাসায় না বলা, অথবা বলার প্রয়োজনীয় বোধ না করা।
৪. কোনো ধরনের দ্বিধা–দ্বন্দ্ব এবং হিতাহিত জ্ঞান ছাড়াই যেকোনো জায়গার উদ্দেশ্যে অপরিচিতদের হাত ধরে বের হয়ে পড়া।
ওপরের আচরণগত মিল থাকলে দেখা যাবে শিশুটি শৈশবে সামাজিক অবহেলার শিকার হয়েছে। যেমন:
১. শিশুর বেড়ে উঠার সময় যে আদর, যত্ন, মমতা, ভালোবাসা প্রয়োজন সেটা সে তার প্রাপ্তবয়স্ক কেয়ারগিভার (মা, বাবা, দাদি, নানি, অথবা কাজের মানুষ যিনি শিশুটিকে যত্ন করতেন) থেকে সে শৈশবে পায়নি।
২. ঘন ঘন প্রাইমারি কেয়ারগিভার পাল্টানো। ফলে শিশুর একটি স্থির ভাবে সম্পর্ক গড়ে ওঠার অভ্যস্ততায় ঘাটতি থেকে যায়।
৩. শৈশবের লালনপালনে একটি অস্বাভাবিক অবস্থা ছিল, যেখানে শিশুটি স্বাভাবিক মনোযোগ পায়নি। যেমন: অনেক কেয়ারগিভার ছিলেন, কিন্তু কেউই শিশুটিকে মমতা দেয়নি। শুধু মাস শেষে টাকা পয়সা নিয়েছেন। শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে ধরার সময় আদরের স্পর্শ ছিল না।
এখন উল্লেখযোগ্য হল, শিশুর মধ্যে যদি এ ধরনের আচরণ বারো মাসের বেশি সময় ধরে দেখা যায়, তাহলে এই ডিসঅর্ডার স্থায়ী। যখন শিশুটির মধ্যে অধিকমাত্রায় সব লক্ষণগুলো প্রকাশিত হবে, তখন এই ডিসঅর্ডারকে আমরা তীব্র মাত্রার বলব।
লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সিলর, সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার
আরও পড়ুন: