অপরিচিতদের দেখলে কোনো কোনো শিশুর ভয় না পাওয়ার কারণ কী?

ডিসইনহিবিটেড সোশ্যাল এনগেজমেন্ট ডিসঅর্ডারে (ডিএসইডি) যেসব শিশুরা ভুগছে, তারা অপরিচিত কাউকে দেখলে মোটেও ভয় পায় না। বরং তারা অপরিচিতদের গাড়িতে উঠতে অথবা তাদের বাসায় যেতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না।

এসব কারণের পেছনে লুকিয়ে আছে শিশুটির জীবনের প্রথম বছর। যে সময় শিশুটি অবহেলার শিকার হয়েছিল। জীবনের প্রথম বারো মাসে শিশুর মধ্যে ডিসইনহিবিটেড সোশ্যাল এনগেজমেন্ট ডিসঅর্ডারের বীজ বপন হয়।

শিশু মনোবিজ্ঞানী হাইম গিনোট বলেন, ‘শিশুরা হচ্ছে ভেজা মাটির মতো, এর উপর যা কিছুই পতিত হয় তার ছাপ ফুটে ওঠে।’ জন্মের পর প্রথম বছরে শিশুর সঙ্গে অবহেলা তার জীবনকে প্রভাবিত করে। এই প্রভাবের ফলশ্রুতিতে শিশু অন্যকে বিশ্বাস করতে পারে না।

খুঁজলে দেখা যাবে, এই মানুষটি শৈশবের অ্যাটাচমেন্ট স্টাইল ছিল ইনসিকিউর। কারণ শিশুকে বিশ্বাসের ব্যাকরণ শেখায় তার কেয়ারগিভার। কেয়ারগিভার ঠিক মতো তাকে খাওয়ালো কিনা? সে যখন কাঁদল তখন তাকে কোলে নিল কিনা? তাকে যখন পরিষ্কার করা দরকার পরিষ্কার করাল কিনা? এই আচরণগুলোই কেয়ারগিভারের সঙ্গে বিশ্বস্ততার সেতু রচনা করে। সেখানে যখন ঘাটতি ঘটে, এর ফল থেকে যায় প্রাপ্তবয়স্কের জীবনেও। শিশু যদি অবহেলা শিকার হয়, সেটা কিন্তু সে ঠিকই বুঝতে পারে। শিশু কাঁদছে আর পরিবারের বড়রা মোবাইল দেখছেন, এটা কিন্তু ভীষণ অবহেলার বিষয়।

ফরাসি বিজ্ঞানী, লুই পাস্তুর চমৎকারভাবে বলেন, ‘যখন আমি বাচ্চাদের দেখি তখন আমার দুটি অনুভূতি হয়—একটি হল আদর ও অন্যটি সম্মান।’

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করতে চাই সন্তান দেখার দায়িত্ব কিন্তু একমাত্র মায়ের নয়। এমন কিছু বাবা আছেন, যারা সন্তানের কান্নায় ঘুমের ব্যাঘাত ঘটবে বলে আলাদা কক্ষে ঘুমান। এই সন্তানদের সঙ্গে সেই বাবাদের কিন্তু বন্ডিং ভালো হয় না। মনে রাখবেন, সন্তান ঠিক যতটুকু আপনার স্ত্রীর, ঠিক ততটুকুই স্বামী হিসেবে আপনার। কাজেই সন্তান লালন পালনের স্ত্রীর দায়িত্ব বলে সামাজিকভাবে রেহাই পেলেও মনস্তত্ত্ব বিজ্ঞানে আপনি অন্যায় করছেন।

চিকিৎসা কি?

১. সাইকোথেরাপি: এক্ষেত্রে সাইকোথেরাপি চমৎকার কাজ করে। তবে মনে রাখতে হবে অনেক সময় লাগবে। সাইকোথেরাপি শিশুকে আবার শৈশবে নিয়ে যাবে। সেখানে কোথায় কোথায় তার ক্ষত তৈরি হয়েছিল, সেটা নিরাময়ের কাজ চলবে। কাজেই সাইকোথেরাপিতে সময় লাগবে।

২. স্থিরতা: এ ধরনের বাচ্চাকে দীর্ঘমেয়াদি, স্থিতিশীল নিরাপত্তা দিন।

৩. বাউন্ডারি: নির্দিষ্ট নিয়ম এবং প্রত্যাশায় বেঁধে আস্তে আস্তে বাউন্ডারি তৈরি করুন। চাপ দেবেন না।

৪. রুটিন: নিয়মিত রুটিন নির্ধারণ করুন, যাতে সে মেনে চলে।

মনে রাখতে হবে আপনার সন্তানটিও সম্মানের দাবিদার। শিশুরা কিছু দেখে না, কিছু বুঝে না—এটা একটি মিথ। শিশুরা বড়দের মতোই, ক্ষেত্রবিশেষে বড়দের থেকেও বেশি মনোযোগের সঙ্গে বুঝতে চেষ্টা করে। শুধু দামি গাড়ি, দামি খাওয়া, দামি পোশাক, দামি উপহার আর বেড়াতে নিয়ে যাওয়া নয়। আপনার কোয়ালিটি টাইম, শিশুর জন্য সব থেকে দামি। 

আহমেদ ছফা চমৎকার বলেছেন, ‘আমার নিজের কাজের মূল্য আছে, তার স্বীকৃতি অন্যেরা দিতে কুন্ঠিত হয়, আমি বসে থাকব কেন? কেউ না দেখুক, আমি তো নিজে আমাকে দেখেছি।’ কাজেই আমি তো জানি, আমি কোথায় কোথায় আমার সন্তানকে ফাঁকি দিয়েছি। যারা সন্তানকে মানুষ হিসেবে সম্মান করেন, তাদের প্রতি সশ্রদ্ধ ভালবাসা।

লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সিলর, সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার, ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার